প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সূচক ঊর্ধ্বমুখী না হতেই চাঙা দুর্বল কোম্পানি

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: টানা পতনের রেশ কাটিয়ে চলতি সপ্তাহে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। সূচকসহ বাড়ছে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি, ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিটের দর। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক বেড়েছে ৭৯ পয়েন্ট। তবে এমন বড় উত্থানেও স্বস্তিতে নেই বিনিয়োগকারীরা। ব্রোকারেজ হাউজে ফিরলেও তারা বাজারের ধারাবাহিকতা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। কারণ, সূচক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চাঙা হতে শুরু করেছে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজার ঘুরে না দাঁড়াতেই চাঙা হতে শুরু করেছে দুর্বল ও ‘জেড’ ক্যাটেগরির কোম্পানির শেয়ার। গতকালের লেনদেনে চিত্রেও এ ধরনের কোম্পানির আধিপত্য লক্ষ করা গেছে। এর মধ্যে লেনদেনের প্রথমদিকে কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। যদিও লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এ পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল না।
এদিন জেড ক্যাটেগরির মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের শেয়ারদর বাড়ে প্রায় ১০ শতাংশ। অন্য দুর্বল কোম্পানির মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের শেয়ারদরও প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে দেখা যায়। সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি দর বৃদ্ধি পায় ইউনিয়ন ক্যাপিটালের শেয়ারের। একইভাবে আইএফআইসি ব্যাংক, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স, ডেলটা স্পিনিং, ঢাকা ডায়িংসহ আরও কিছু দুর্বল প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়।
এদিকে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের অভিমত, বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেই একটি চক্র দুর্বল ও ‘জেড’ ক্যাটেগরির কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে মেতে ওঠে। সে কারণে এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। দর বৃদ্ধি পেতে দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে স্বল্পসময়ে অধিক মুনাফা করা। যদিও বেশিরভাগ সময় এর উল্টো চিত্র দেখা যায়।
জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় না বুঝে কোনো বাছবিচার ছাড়াই ঝোঁকের বশে বিনিয়োগ করেন। এটা ঠিক নয়। জুয়াড়িরা সাধারণত দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির সুযোগ বেশি পায়। সে জন্য বিনিয়োগকারীদের উচিত, কোম্পানির মৌলভিত্তি বিচার করে বিনিয়োগ করা। কারণ, ভালো কোম্পানির শেয়ারের সঙ্গে থাকলে খুব বেশি ভালো না হলেও লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাদের একটি কথা সব সময় মনে রাখা দরকার আর সেটা হচ্ছে পুঁজি তাদের, অর্থাৎ এটি নিরাপদ রাখার প্রধান দায়িত্বও তাদের।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল হবেÑএমন প্রত্যাশা নিয়ে ফিরে আসছেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বাজারে ফিরেও স্বস্তি মিলছে না। সম্প্রতি লেনদেন কিছুটা সন্তোষজনক হলেও এটা কৃত্রিম কি না, সে বিষয়টি তাদের ভাবাচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন তারা। ভুক্তভোগীরা বলেন, হঠাৎ আলোর ঝিলিক নয়, আমরা পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা দেখতে চাই, সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে যা একেবারেই নেই বললেই চলে।
লেনদেন চিত্রে দেখা যায়, তিন কার্যদিবস আগে ডিএসইর প্রধান সূচকের অবস্থান ছিল চার হাজার ৮৫৫ পয়েন্টে। গতকাল স্থির হয়েছে পাঁচ হাজার পয়েন্টে। অর্থাৎ, এ সময়ের মধ্যে সূচক বেড়েছে ১৪৫ পয়েন্ট।
এদিকে বড় পতন থামার পর বদলে গেছে ব্রোকারেজ হাউজের চিত্র। কয়েক দিন আগের হাউজগুলোয় যে ছিল সুনসান নীরবতা। গতকাল হাউজগুলোয় এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হওয়ায় বাজারের চেহারা বদলে গেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউজগুলোয় বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ছিল ভালো। গত সপ্তাহেও হাউজে এমন চিত্র দেখা যায়নি। এসব হাউজের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে আসায় তারাও পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন। তবে এটা দীর্ঘমেয়াদি হবে কি না, তা নিয়ে দোলাচলে রয়েছেন তারা।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ব্রোকারেজ হাউজে ফিরলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। তারা জানান, পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ালেও তা স্থিতিশীল হবে কি না, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার চান। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয়। তারা সক্রিয় থাকলে বাজার আরও ভালো হবে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জানতে চাইলে ডিবিএ’র প্রেসিডেন্ট ও শাকিল রিজভী স্টক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল রিজভী শেয়ার বিজকে বলেন, বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসছেন, এটা পুঁজিবাজারের জন্য শুভ লক্ষণ। একই সঙ্গে এটি আমাদের জন্যও ভালো খবর। কারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার লেনদেন না করলে আমাদের আয় কমে যায়। তখন আমাদের ব্যবসা চালাতেও হিমশিম খেতে হয়।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে একটি শ্রেণি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাই কৃত্রিমভাবে সচকের হ্রাস-বৃদ্ধি করে নিজেদের ফাইদা হাসিল করে নিচ্ছেন। মাঝখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

সর্বশেষ..