প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি অনেক শিক্ষকের কাছেই বোধগম্য হচ্ছে না

 

একরামুল ইসলাম তুষার: শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে জ্ঞানচর্চা ও মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে আমাদের শিক্ষার্থীদের। আর জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে হবে। তবেই আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবো। যুগের চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে শিক্ষাকে অর্থবহ করে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি। শিক্ষকরাই সৃজনশীল পদ্ধতি বুঝে উঠতে পারছেন না। তবে তারা কীভাবে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝতে সক্ষম হবেন। এ কারণে মাঠে মারা যাচ্ছে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি। সফল হচ্ছে না সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির উদ্দেশ্য ও আদর্শ।

এবার আশা যাক সৃজনশীলের প্রবক্তার বিষয়ে। আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ বেনজামিন স্যামুয়েল ব্ল–ম সৃজনশীলের উদ্ভাবক। ব্ল–ম সৃজনশীলের ছয়টি বিষয় নিয়ে চিন্তাস্তরকে চিহ্নিত করেছিলেন। ১৯৫৬ সারে ব্ল–ম যে হ্যান্ডবুক প্রকাশ করেন, সে অনুযায়ী নিম্নতর চিন্তার তিনটি স্তর হচ্ছে জ্ঞান, অনুধাবন ও প্রয়োগ। আর উচ্চতর দক্ষতার তিনটি স্তর হচ্ছে বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ ও মূল্যায়ন। ২০০১ সালে ব্ল–মের ছাত্র লরিন এন্ডারসনের নেতৃত্বে একদল বিশেষজ্ঞ এটি ঢেলে সাজান। ব্ল–ম যেটাকে জ্ঞান বলেছেন তারা সেটাকে ‘মনে করা’ অনুধাবন হয় ‘বুঝতে পারা’ প্রয়োগ হয় ‘প্রয়োগ করা’ আর বিশ্লেষণ হয় ‘বিশ্লেষণ করা’ বা সৃষ্টি করা।

ব্ল–ম ও এন্ডারসনের ছয়টি স্তর থাকলে আমাদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে চারটি স্তর আছে। আমার প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্ল–মের সৃজনশীল পদ্ধতি অনুসৃত হয় কি না। আমরা জানি, উন্নত বিশ্বে কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হলে তা আমাদের মতো দরিদ্র দেশে প্রয়োগ করা হয়। এরপর সফল হলে তখন তাদের দেশে প্রয়োগ করা হয়। আমাদের মতো দেশের জনগণকে এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে আমাদের দেশে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। উদ্দেশ্য মুখস্থবিদ্যা থেকে শিক্ষার্থীদের নিষ্কৃতি দেওয়া। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলের ভীতিই কাটেনি। সঙ্গে সঙ্গে বলা যেতে পারে সৃজনশীল নিয়ে শিক্ষকদের ভীতি আরও বেশি। শিক্ষকরা পাঠদান করাতে পারছেন না শিক্ষার্থীদের। প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রশ্নপত্র তৈরিতে অন্য প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিতে হয়। আবার কোনো শিক্ষক গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন সৃজনশীল পরীক্ষায়। ২০১৬ সালে জেএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডের বাংলা প্রথম পত্র সৃজনশীল প্রশ্ন গাইড বই থেকে হুবহু কপি করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রমাণ আছে।

কোনো পদ্ধতি চালু করার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেই পদ্ধতি প্রবর্তন করা উচিত। সৃজনশীল পদ্ধতি আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হজম করতে সক্ষম কি না, তা ভেবে দেখা উচিত ছিল। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ১৯৯২ সালে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম। সেসময় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ও রাজধানীর মুখস্থ করেছিলাম, তা আজও আমার মনে আছে। কিন্তু বর্তমানে এইচএসসি জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশাকার কে, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস কবে, জাতীয় স্মৃতিসৌধ কোথায় প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর জানে না। তাহলে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা কী শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতি হিসেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি না পিছিয়ে, ভেবে দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়, বিশ্বে যত ধর্মীয় গ্রন্থ আছে তার পঠন-পাঠনের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু মুখস্থবিদ্যা। তাই মুখস্থবিদ্যাকে অস্বীকার করা যায় না।

সৃজনশীল প্রশ্ন বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, এর উপযোগিতা আছে কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। প্রথমেই আসা যাক, প্রাথমিকের শিক্ষকদের সৃজনশীলের কথা। প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষার মূল ভিত্তি। আর এ ভিত্তি মজবুত হওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিকের অনেক শিক্ষকই সৃজনশীল প্রশ্ন বুঝতে পারেন না। রিসার্চ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কমপ্লিট এডুকেশনের এক জরিপে প্রাথমিকের শিক্ষকদের সৃজনশীলের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রাথমিকের ১৩ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল বোঝেন না। ৪২ শতাংশ শিক্ষক সীমিত আকারে বুঝলেও ক্লাসে বোঝাতে পারেন না। সৃজনশীল না বোঝার কারণে ৪৭ শতাংশ শিক্ষক বাজারের গাইড বইয়ের নির্ভর করে।

সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরিতে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষকরাও। ২০১৪ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের স্ব স্ব বিষয়ে পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র তৈরি করতে বলা হয়। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র কিনে বা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৫ সালে মাউশির এক জরিপের তথ্যমতে, ৪৫ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না।

এবারের আলোচ্য বিষয় অঞ্চলভিত্তিক সৃজনশীলের চালচিত্র। মাউশির সর্বশেষ একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অর্ধেকের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেরা সৃজনশীলের প্রশ্ন প্রণয়ন করছে না। দেশে ১৮ হাজার ৫৯৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। গত বছর মে মাসে ৯টি শিক্ষা প্রশাসনিক অঞ্চলের ছয় হাজার ৪৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সুপারভিশন করে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে। প্রতিবেদন দেখা গেছে, সৃজনশীল পদ্ধতির বাস্তবায়নে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে বরিশাল। এ অঞ্চলের ৫৪৩টি বিদ্যালয়ে দেখা গেছে ৪৯৯টি বিদ্যালয়ই বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করেছে। ১৭টি বিদ্যালয় অন্য সহায়তায় প্রশ্ন প্রণয়ন করেছে। মাত্র ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিক্ষক নিজেরা সৃজনশীলের প্রশ্ন প্রণয়ন করেন। সৃজনশীলের প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে রাজশাহী বিভাগ। ৯২০টি বিদ্যালয়ে সুপারভিশন করে দেখা গেছে, ৭৩২টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজেরা প্রশ্ন প্রণয়ন করেছেন। ঢাকা অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় প্রশ্ন প্রণয়ন করেন ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ ৯ দশমিক ২২ শতাংশ। ময়মনসিংহ অঞ্চলে অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় প্রশ্ন প্রণয়ন করে ৩৫ দশমিক ২০ শতাংশ, বাইরে থেকে সংগ্রহ করে ১৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিলেট ২৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ, চট্টগ্রাম ৩০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, রংপুর ৩৩ দশমিক ২৬ শতাংশ, খুলনা ৩১ দশমিক ৭২ শতাংশ, কুমিল্লা ৩১ দশমিক ৯২ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় সৃজনশীল প্রশ্ন সংগ্রহ করে।

২০১৫ সালের নভেম্বরে মাউশির একাডেমিক সুপারভিশন প্রেিতবেদনে বলা হয়েছে, বরিশাল অঞ্চলে ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করেছে। বাইরে থেকে কম প্রশ্ন কিনেছিল সিলেট। ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ঢাকা ২১ দশমিক ৪৮ শতাংশ, রংপুর ১৫ দশমিক ১৪ শতাংশ, রাজশাহী ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ, খুলনা ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, কুমিল্লা ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৩৯ দশমিক ১৫ শতাংশ, চট্টগ্রাম ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একাডেমিক সুপারভিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশে বলা হয়, শিক্ষকরা যাতে সৃজনশীলের প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন, সে ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণসহ বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে না পারে সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম গবেষক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, সৃজনশীলের ওপর শিক্ষকদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এছাড়া অনেক শিক্ষকের যোগ্যতারও অভাব রয়েছে, যে কারণে সরকারের বিভিন্ন প্রশিক্ষণেও তারা প্রশিক্ষিত হতে পারছেন না। প্রশ্ন তৈরির জন্য শিক্ষকদের সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব রয়েছে। এ কারণেই শিক্ষকরা নোট বা গাইড বইয়ের দিকে ঝুঁকছেন।

পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সৃজনশীল করা হয়েছে। শিশুদের এতটা সৃজনশীল হওয়ার কী প্রয়োজন। শিশুদের শিক্ষা হতে হবে আনন্দের সঙ্গে। গণিতে সৃজনশীল কেন প্রয়োজন? জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ ও শিক্ষা আইন-২০১৬ নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা ধারা, উপধারায় এমনভাবে বিভক্ত হয়েছে যে, তা জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কথিত সৃজনশীল পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিমুখ ও জ্ঞানবিমুখ করছে। তিনি আরও বলেন, সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তন করে এমন পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের মনে পাঠানুরাগ, জ্ঞানস্পৃহা তৈরি করবে।

প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপদ্ধতি দেখতে যান সরকারিভাবে প্রায় ৩০০ জন সরকারি কর্মকর্তা। বিশেষ করে সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস ইনহান্সমেন্ট, টিচার্স কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম, হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি ইনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট। সফরগুলোতে একই ব্যক্তি বারবার যাচ্ছেন। যাদের যাওয়ার কথা না তারাও যাচ্ছেন। এর মধ্যে শিক্ষা খাতের বাইরের ব্যক্তিও রয়েছে। ফলে শিক্ষাপদ্ধতি তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

শিক্ষাবিদ ড. একেএম শাহনাওয়াজ বলেছেন, আমাদের নীতিনির্ধারকদের দুটি সমস্যা। প্রথমত, তারা কারিকুলাম সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। যে কোনো বিষয় গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হলেও তা দেশে করা হয় না। আবার কর্তাব্যক্তিরা বাইরে থেকে একটা কিছু দেখে এসেই তা চালু করে দেন। অর্থাৎ তাদের মাথা থেকে বেরোলেই তা চাপিয়ে দেওয়া হয়। যখন যিনি দায়িত্বে আসেন তিনিই নতুন কিছু করতে চান। কিন্তু তা বাস্তবসম্মত কি না, তা চিন্তা করেন না। এতে গিনিপিগ হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্র্থীরা। সব সময় তাদের থাকতে হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই।

সৃজনশীলকে কার্যকর করতে হলে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের দিকে তাগিদ দেওয়াসহ যোগ্যতার দিকে প্রাধান্য দিতে হবে। শিক্ষকদের জন্য সৃজনশীলের গাইডলাইন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাঠ্যবইয়ে অধিক পরিমাণে উদ্দীপক দিতে হবে এবং বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বাদ দিয়ে সে স্থলে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন প্রবর্তন করতে হবে।

 

সহকারী অধ্যাপক

আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ

কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ