প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে সংশয় কাটুক

‘তিন বহুজাতিকের নিয়ন্ত্রণে টেলিকম খাত’ শিরোনামে গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত খবরটি অনেক পাঠকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। সেখানে আমাদের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, বেশকিছু পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে গ্রাহকসংখ্যা, বেতার তরঙ্গ ব্যবহার, কর-পরবর্তী মুনাফা ও বিনিয়োগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে টেলিকমিউনিকেশন খাতে এগিয়ে রয়েছে তিনটি বহুজাতিক কোম্পানিÑগ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত দুর্বলতায় ধুঁকছে এক সময়কার আলোচিত কোম্পানি সিটিসেল। আর এ তালিকায় পণ্যসেবায় অসন্তুষ্টি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় পিছিয়ে থাকা অথচ দেশে প্রথম থ্রিজি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটক। খেয়াল করার মতো বিষয়, গ্রামীণফোনের মাতৃকোম্পানি টেলিনর কার্যক্রম পরিচালনা করে বিশ্বের ১১টি দেশে। সব মিলিয়ে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ২০ কোটির বেশি; যার মধ্যে বাংলাদেশেই রয়েছে আনুমানিক সাড়ে ৫ কোটি গ্রাহক। উল্লেখ্য, গত পাঁচ বছরে গড়ে বার্ষিক ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে গ্রামীণফোন। এদিকে এয়ারটেলকে একীভূতকরণের পর প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ গ্রাহক নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রবি। লক্ষ্য করার মতো বিষয়, প্রতিষ্ঠানটি এখনও পরিপক্ব অবস্থানে পৌঁছেনি। বরং তাদের বহু সম্ভাবনাই এখন পর্যন্ত অবিকশিত রয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান। সেক্ষেত্রে অনেকে ধারণা করেন, আগামীতে গ্রামীণফোন ও রবির মাঝে ভালো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে বাজারে প্রাধান্য বিস্তারের লড়াইয়ে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, মোটামুটি নীরবেই ব্যবসা করে চলেছে এক সময় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা টেলিকম কোম্পানি বাংলালিংক। বর্তমানে তাদের গ্রাহকসংখ্যা হতে পারে রবির চেয়ে কম। কিন্তু এক চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই কোম্পানিটির আয় হয়েছে মোটামুটি ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা। আলোচ্য খাতে সবচেয়ে পিছিয়ে সিটিসেল। সম্প্রতি বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন) পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পাওনা পরিশোধের শর্তে ১৭ দিন পর চালু হয় সিটিসেল। এখানে টেলিটকের কথা উত্থাপন না করাই উত্তম। গ্রাহক অসন্তুষ্টির পাশাপাশি কোম্পানিটি অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত বলে অভিযোগ কিন্তু ব্যাপক।

লক্ষণীয়, এ দুই দশকেই আমাদের টেলিযোগাযোগ খাত সংকুচিত হয়ে এসেছে অনেকটা। তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে একীভূতকরণের চাহিদা থাকতেই পারে। এক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য নিয়েও অভিযোগ জানানোর কিছু নেই। টেলিযোগাযোগ খাতে (অপারেটর বাদে) স্থানীয় কোম্পানিকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করানোর চেষ্টা বিটিআরসির কম ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো সফল হতে পারেনি সেভাবে। যা হোক, কোম্পানির নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যবসা মঞ্চে নতুনভাবে আবির্ভূত হওয়ার প্রচেষ্টাও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু টেলিকম খাতে তিন বহুজাতিক কোম্পানির প্রাধান্য নিয়ে দুশ্চিন্তা অন্যখানে। সেটি হলো, বাংলাদেশে অপারেটর ব্যবসা এখন পর্যন্ত যথেষ্ট লাভজনক এবং আগামীর জন্য ক্ষেত্রটি সম্ভাবনাময়। খেয়াল করা দরকার, ইন্টারনেটের নানামুখী ব্যবহার এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দেশে। তার বাইরে দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে মানসম্মত ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণের ইস্যুটি না হয় এখানে উহ্যই থাকলো। ফলে এ বাজারটিতে জনস্বার্থে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এ ধরনের বাজারে প্রকৃতপক্ষে মাত্র তিনটি কোম্পানির অবস্থান দলবদ্ধ ব্যবসা বা অলিগোপলির সুযোগ সৃষ্টি করে কি না, তাও দেখার বিষয়। এ অবস্থায় সবাই চাইবেন, বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বিটিআরসি। সে লক্ষ্যে টেলিটককে আরও শক্তিশালী করে কোনো ফায়দা পাওয়া যায় কি না, দেখা দরকার; দেখা উচিত, সিটিসেলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও। কেননা এক্ষেত্রে অলিগোপলির সৃষ্টি হলে গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে কোম্পানির আগ্রহ কম থাকবে স্বভাবতই। তাতে গ্রাহক তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেনই, সঙ্গে সঙ্গে বাধাগ্রস্ত হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন।