প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সেবা খাতে বাণিজ্য ঘাটতি ভাবনার বিষয়

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুসারে গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘জুলাই-নভেম্বরে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৮৮ কোটি ডলার’ শীর্ষক খবরটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। বিষয়টি ভালো না মন্দ, তা নিয়ে মন্তব্যের আগে ইতিবাচক কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টিপাত জরুরি। খেয়াল করার মতো বিষয়, গত অর্থবছরের (২০১৫-১৬) জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগের (নিট এফডিআই) পরিমাণ ছিল ৬৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অঙ্কটি ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়ে ৭১ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) জুলাই-নভেম্বরে। উল্লেখ্য, এখানে নিট এফডিআই হচ্ছে, স্থানীয় বিভিন্ন খাতে বিদেশ থেকে সরাসরি আসা বিনিয়োগ হতে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দেশে মুনাফার অর্থ পাঠানোর পর এখানে থেকে যাওয়া অংশ। এদিকে একই সময় আমাদের পুঁজিবাজারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিট বিদেশি বিনিয়োগ (১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার) এসেছে বলে প্রতীয়মান। উপর্যুক্ত দুটোই ইতিবাচক চিত্র। সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই ধরে নিতাম, যদি শিল্প খাতে কাঁচামাল আমদানি বেড়ে যাওয়ায় এটা সৃষ্টি হতো। তখন আমদানি ব্যয় বাড়লেও ভরসা ছিলÑমূল্য সংযোজিত পণ্য রফতানির পর যে লাভ হবে, তাতে আমদানি ঘাটতি পূরণপূর্বক খানিকটা অর্থ হয়তো উদ্বৃত্তও থেকে যাবে আমাদের। পরিমাণে যা-ই হোক, সাম্প্রতিক সময়ে তার কিছু কিন্তু অর্জন হয়েছে আমাদের। সমস্যা হলো, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস তথা জুলাই-নভেম্বরে যে ৩৮৮ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির খবর ছাপা হয়েছে, তার বেশিরভাগই সেবা খাতে সৃষ্ট। চলতি অর্থবছরের এ পাঁচ মাসের সঙ্গে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনা করলে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৭৩ কোটি ডলারের মতো। কিন্তু সে হিসাবকে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন সেবা খাতে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে। লক্ষণীয়, অন্যান্য খাতে বাণিজ্য ঘাটতির উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ উদ্যোগের চেয়ে বেশি প্রভাব থাকে আন্তর্জাতিক বাজারের। সেবা খাতের ওপর বৈশ্বিক বাজারে শক্তির প্রভাব থাকে না, তা নয়। প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টায় সেবা খাতে যথেষ্ট উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।

প্রধানত বিদেশে চিকিৎসা, ভ্রমণ ও উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত ব্যয় সেবা খাতের আমদানি ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের প্রতিবেদক বলছেন, এক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সেবা খাতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩৭ কোটি ডলার। পাশাপাশি এ তথ্য উল্লেখ করাও অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের রেমিট্যান্স অন্তঃপ্রবাহ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। তার একটি কারণ, মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে, বিশেষত বাংলাদেশ ঐতিহ্যিকভাবে যেসব দেশে জনশক্তি রফতানি করে থাকে, সেসব দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সার্বিকভাবে এখান থেকে অধিক হারে অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ জনশক্তি পাঠানো। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, বৈধ পথে না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে বেশি হারে রেমিট্যান্স পাঠানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা বন্ধে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না তেমনটি কেউ বলবেন না। তবে কী করে গৃহীত ওই উদ্যোগগুলো থেকে বেশি সুফল নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আরও বেশি দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণ, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ বৃদ্ধি ও স্থানীয় চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে জোর দিতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন, গত বছর রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় নৃশংস হামলার পর এবং সামগ্রিকভাবে দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারে একশ্রেণির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততার পর থেকে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমন বেড়ে থাকতে পারে। ঘটনাটি তাই ভালোভাবে খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।