সম্পাদকীয়

সোনালি আঁশ ফিরে পাবে গৌরব

হাসান সাইদুল: কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে পাট প্রথম স্থানে রয়েছে। পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটকে সোনালি আঁশ বলা হতো। পাট ও পাটজাত দ্রব্য বাজারজাত করে একসময় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হতো বলে পাটকে সোনালি আঁশ বলা হতো। একমাত্র পাট বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল হিসেবে বিশ্ববাজারে সোনালি আঁশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। একসময় পৃথিবীর উৎপাদিত পাটের ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপন্ন হতো; এমনকি এ পাট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্জিত হতো। এ খাতে দেশের সবচেয়ে বেশি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে তিন কোটি মানুষের কর্মজীবন এ পাটশিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

জাতীয় সংসদ ভবনের ঠিক উল্টো দিকে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বায়োটেকনোলজি বিভাগের একটি পুরোনো দোতলা ভবনকে সংস্কার করে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এখানে পাটবিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। এ ভবনেই পাটের জন্য ক্ষতিকর ছত্রাক ও দেশি পাটের জীবন রহস্য উম্মোচনের মতো ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে ২০১০ সালের ১৬ জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর কাছে তোষা পাটের জেনোম সিকোয়েন্স উদ্ঘাটনের কথা জানান। ‘জুট জেনোম সিকোয়েন্স’ শিরোনামে সরকারি তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে এ গবেষণার কাজটি শুরু হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পাটের জন্য ক্ষতিকর এক ধরনের ছত্রাকের ‘জীবন রহস্য’ উম্মোচন হওয়ার খবর দেন। পাটের ‘জীবন রহস্য’ উম্মোচনের নেতৃত্বদানকারী হলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞানের অধ্যাপক বাংলাদেশের মাকসুদুল আলম (প্রয়াত)। এর আগে তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা তোষা পাট ও পাটের জন্য ক্ষতিকারক এক ধরনের ছত্রাকের জেনোম সিকোয়েন্স উম্মোচন করেন।

জেনোম সিকোয়েন্সের ঠিক আগের ধাপ ‘সংকরায়ণ’ নিয়ে কাজ করেছিলেন বিজেআরআই’র সাবেক বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আহমেদ শামসুল ইসলাম। তার এ গবেষণাটি প্রবন্ধ আকারে ১৯৬০ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘জার্নাল অব প্যান্ট টিস্যু কালচার অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি’তে তার নেতৃত্বে পাটের জিন ক্লোনিং নিয়ে প্রকাশিত হয় একটি গবেষণা প্রবন্ধ। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণারও অগ্রগতি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ভারতীয় বিজ্ঞানীর সঙ্গে আমি যৌথভাবে পাটের জেনোম নিয়ে কাজ শুরু করি। আমাদের কাজটি ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। এরপর অধ্যাপক মাকসুদুল এ কাজটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন।

২০১০ সালের জুন মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মাকসুদুল আলম বলেছিলেন, বাংলাদেশিদের জন্য পাট শুধু একটি অাঁশ উৎপাদনকারী গাছ নয়। বরং এটা আমাদের জাতীয় প্রতীক। পাটের সঙ্গে আমাদের সোনার বাংলা ধারণার একটা যোগসূত্র আছে। সোনার বাংলা ঘিরে গড়ে উঠেছে আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য, সেখানে ঢেউ খেলানো সোনালি ধানখেত আর সোনালি অাঁশ এ দুটি যেন আমাদের মুক্তির সন্ধান দেয়। এ কথাগুলো বলেছেন অস্ট্রেলিয়ানিবাসী জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী (যিনি এ প্রকল্পের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা) তার ‘সোনালি আঁশ’ লেখায়। পাট নিয়ে গবেষণার মূলমন্ত্র ছিল এ কথাগুলোই। দারুণ মেধাবী ও দেশপ্রেমী একটি দল পাট নিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছে একদম সঠিক সময়ে।

সোনালি আঁশ থেকে সোনালি সুতা

পাটকে তুলার বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করতে যে বাধা আছে তা আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এ বাধা দূর করাই এখন আমাদের কাজ। সুতা তৈরি করতে প্রতিবছর মোট চাহিদার ৯৭ শতাংশ তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সুতা উৎপাদনের উপযোগী পাটের আঁশ উদ্ভাবন করা গেলে তুলা আমদানির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি। তিন বছর আগে আমাদের দেশে গবেষণায় তোষা পাটের জীবন নকশা উম্মোচন করার কাজ চলছিল। এমনকি অনেকাংশে সাফল্যও আসে। বাংলাদেশকে আর বিশ্ব অবহেলা করতে পারবে না। আশা করা যায়, পাঁচ বছরের মধ্যেই গবেষণার ফল কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

 

এদিকে পাট দিয়ে কাগজের কাঁচামাল ‘পালপ’ তৈরির কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। এটি সম্ভব হলে ‘পালপ’ রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে বাংলাদেশ। বর্তমানে সরকার পাটের ব্যবহার বাড়াতে পাটের প্যাকেজিং সামগ্রী আইন অনুমোদন করেছে। এ আইন অনুযায়ী খাদ্যশস্য, চিনি, সার, সিমেন্টের মতো পণ্য প্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাট আড়াই হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে কৃষকও ভালো দাম পাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে চার লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে ৪৯ লাখ ৭০ হাজার বেল পাট উৎপাদিত হয়। চলতি বছরে ৮০ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৭৮ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। তবে ২০১০-১১ অর্থবছরে পাট রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১১১ কোটি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। জেলার কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলা পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ১৫ হেক্টর; কিন্তু চাষ হয় আট হাজার ৯২৭ হেক্টর, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক হাজার ৭২৭ হেক্টর কম। সারা দেশেই পাট আবাদ ও উৎপাদন কমছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশের আট লাখ ৬০ হাজার বেল পাট উৎপাদন হলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৭৮ লাখ ৩৭ হাজার বেল এবং চলতি অর্থবছর উৎপাদন ৬৫ লাখ বেলের নিচে আসতে পারে বলে এক পূর্বাভাসে জানা গেছে।

তবুও প্রত্যয়

পাটের বহুমুখীকরণে বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে বেনারসি শাড়ি, জুতা ও জুতার সোল, জানালায় বিলাসী পর্দা, কম্বল, সোয়েটার, জিন্সের প্যান্ট, পাঞ্জাবিসহ নানা পণ্য। সম্প্রতি ভারতের মতো পাট দিয়ে গাড়ির যন্ত্রাংশও তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার। দেশের বাইরেও এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পাট রফতানি বেড়েছে ৭১ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৬.৭৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে পাটজাত পণ্যের রফতানি বেড়েছে ১৮.৮১ শতাংশ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন কাঁচা পাটের দাম ৪৩.৪১ ডলার ও পাটজাত পণ্য ৫৮৭.২৫ ডলার। টয়োটা গাড়ির বডিতে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশের পাট।

ফিরে আসবে সোনালি আঁশের

সোনালি অতীত

বাংলাদেশ ও আগামী প্রজন্মের জন্য এটা অমূল্য সম্পদ। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাই এটা আবিষ্কার করেছেন। পাটে ‘লিগনিন’ অধিক মাত্রায় থাকায় বস্ত্রশিল্পে এর ব্যবহার সীমিত। বিজেআরআই উদ্ভাবিত ধবধবে সাদা আঁশের পাটের জাত চাষ করতে গিয়ে ছত্রাক আক্রান্ত হওয়ায় সাফল্যের মুখ দেখেনি। এ ছত্রাককে প্রতিহত করতে যে জিন দরকার সেটা ওই পাটে সন্নিবেশিত করলে তা রোগমুক্ত হবে। তখন বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে পাটকে ব্যবহারের দ্বার হবে উম্মোচিত । ফলে ভালো জাতের পাটের ফলন বেড়ে যাবে। কৃষকরাও উপকৃত হবেন।

 

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কামাল উদ্দিন বলেন, এখন ৫০ শতাংশ তুলার সঙ্গে ৫০ শতাংশ পাটের আঁশ মিশিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি হচ্ছে। পাটের জেনোম সিকোয়েন্স হাতে পাওয়ায় এ গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উšে§াচিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এভাবে অব্যাহত থাকলে ১০ বছরের মধ্যেই পাট ফিরে পাবে তার সোনালি অতীত।

 

hassansayadulÑgmail.com

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..