মত-বিশ্লেষণ

সোনালি আলোয় ভরে যাক স্বপ্নময় কৈশোর

জিনাত আরা আহমেদ:‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’ এই কবিতার লাইনগুলোর মতোই কিশোরদের ভাবনা। তারা নতুনকে আবিষ্কারের মাধ্যমে জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চায়। দুচোখে তাদের অপার সম্ভাবনা ও স্বপ্ন। এই স্বপ্নের বাস্তবায়নেই একটি সমাজ পরিপূর্ণ ওঠে।

বর্তমানে কিশোরদের নিয়ে সংঘটিত কিছু ঘটনার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট সমাজ-সচেতনদের ভাবিয়ে তুলেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিশোরদের সংঘটনে বেশ কিছু হত্যা ও অপরাধ সমাজের জন্য যেন অশনি সংকেত। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট যেমন ‘উড়াল সড়কে ছিনতাই করে কিশোর গ্যাং’ (প্রথম আলো, ৭ আগস্ট), ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিবাদে প্রাণ গেল দুই ছাত্রের’ (প্রথম আলো, ১২ আগস্ট ), বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে শত শত মানুষের সামনে স্কুলছাত্রকে হত্যা (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৬ আগস্ট)। ঘটনাগুলো পত্রিকায় ছাপার কারণে আমরা উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন দিন কিশোর অপরাধীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এখনই উপযুক্ত উদ্যোগ না নিলে এটা সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে।

কিছুদিন আগে যশোরে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে দুই কিশোরকে হত্যা করা হয়। এ ধরনের ঘটনা আমাদের ভীষণভাবে মর্মাহত করে। গত ২৫ জুলাই প্রথম আলোর শেষ পাতায় ‘উড়াল সড়কে রশি বেঁধে ছিনতাই’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয় ফেব্রুয়ারির পর গত দু’মাসে ৫০টির মতো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব ছিনতাইকারীদের বেশিরভাগই কিশোর, এরা নেশার টাকার জন্য ছিনতাই করে। এগুলো ছাড়াও দেশের আনাচে-কানাচে রয়েছে কিশোর অপরাধীদের অসংখ্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ড। এসব ঘটনার জন্য অনেক কিছু দায়ী।

সবার জীবনেই কিশোর বয়সটা খুব আবেগপূর্ণ একটা সময়। এ সময় মনে অনেক স্বপ্ন থাকে এবং অনেক কিছু করতে ইচ্ছা হয়। কিছুটা স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠে মন। এ সময় বাধা পেলে তাই কেউ কেউ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। কিশোর অপরাধীরা এমনিতেই অপরাধী হয়ে ওঠে না, এর পেছনে থাকে নানা ধরনের পারিপার্শ্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। কোনো কোনো শিশু পরিবারে অশান্তি, দারিদ্র্য অথবা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে মনে মনে কষ্ট পায় এবং বিষয়গুলো অবদমন করে রাখে। কোনো এক সময় এই অবদমিত রাগ, ক্ষোভ ও কষ্ট অপরাধের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অনেক পরিবারে বিত্তবৈভব ও বিলাসিতার কারণেও শৈশব থেকে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে কিছু কিশোর। কখনও আবার সঠিক পরিচালনার অভাবেও কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দেখা গেছে শৈশব ও কৈশোরে সঠিক মনোযোগের অভাব অনেককে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। বর্তমানে সচ্ছলতার জন্য বাবা-মায়েদের দীর্ঘসময় কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাবা-মায়ের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশু যেমন ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে না, তেমনি কাজের মানুষের কাছ থেকে ভুল ধারণা পেয়েও শিশুরা অনেক ধরনের অন্যায় করে। এভাবে দিনে দিনে নীতিহীন হয়ে ওঠে কিশোরেরা।

মূলত কিশোর অপরাধী কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে যেমন আশঙ্কা জেগে ওঠে, তেমনি আশার জায়গাটিও বড় রকমের ধাক্কা খায়। এই কিশোরেরা একদিন বড় হবে, মিশে যাবে সমাজের ভালো-মন্দ মানুষের সঙ্গে। তাদের কাছে জিম্মি হবে সাধারণ মানুষ। এই বয়সেই তারা সমবয়সীদের কাছে আতঙ্ক, তারপর আবার সমাজের জন্য বিপদসংকেত। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের জন্য যে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে, তা বলাই বাহুল্য। তাই দেশের কল্যাণে কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বয়স কম থাকায় কিশোর অপরাধীরা বড় ধরনের শাস্তির আওতায় আসে না। এতে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে পড়ে কিশোর অপরাধীরা। স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে ক্রমান্বয়ে বড় বড় অপরাধে যুক্ত হয়। অনেক সময় শিশু-কিশোরদের মাদক আনা-নেওয়ার কাজে জড়িত করে কিছু মাদক ব্যবসায়ী। কখনও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এলাকার মাস্তানরা কিশোরদের দিয়ে অপরাধ করায়। এছাড়া মোবাইলে ভিডিও গেম কিংবা অপরাধসংক্রান্ত মুভি থেকে উৎসাহিত হয়েও কিছু কিশোর অপরাধী হয়ে ওঠে। আজকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু বখে যাওয়া শিক্ষার্থীদের দেখা যায় ক্ষমতা জাহির করতে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ তৈরি করছে। শুধু তাই নয়, তাদের ফিল্মি কায়দায় এলাকায় মহড়া দিতেও দেখা যায়। তাদের জন্য শুধু সমবয়সিরাই আতঙ্কে থাকে না, রীতিমতো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি হয়।

বিশ্লেষকরা অনেকেই বলছেন, তথ্য-প্রযুক্তির কারণে শিশু-কিশোরদের নৈতিক স্খলন হচ্ছে। মূলত আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, আকাশ-সংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ। পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাতেই গত কয়েক বছরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০টি এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন জেলা শহরের কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। তারকাখ্যাতি, হিরোইজম, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্বতা, অর্থলোভ, শিক্ষাব্যবস্থার ঝুঁকি এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়ায় তাদের সামাজিকীকরণ ও মানসিক বিকাশ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে সমাজের বিভিন্ন গ্যাং কালচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে কিশোরেরা। যেখানে শিশু-কিশোরদের সামাজিকীকরণের প্রথম ধাপ ছিল পরিবার, সেখানে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের স্যোশাল মিডিয়া।

কিশোরদের গ্যাং কালচার এবং কিশোর অপরাধ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টিকটক ও লাইকিতে বিভিন্ন ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের পদচারণা এবং তাদের কর্মকাণ্ড সহজেই দৃশ্যমান হচ্ছে সমাজের মানুষের কাছে। তাই এই সমস্যা নিরসনে দরকার সামাজিক আন্দোলন। এক্ষেত্রে পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে বেশি, কারণ পরিবার মানুষের আদি সংগঠন ও সমাজজীবনের মূলভিত্তি। পরিবারের ছেলেমেয়েরা কার সঙ্গে মিশছে, কীভাবে বড় হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। শহরের শিশু-কিশোররা পরিবার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এর ফলে তারা মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই পরিবারের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে কিশোরদের গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা এবং তাদের সংশোধনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থাকতে হবে। কিশোরদের সমাজের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।

শিশুর সুস্থ মানসিক গঠনের জন্য নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আজকের শিশু আগামী দিনের কিশোর, ভবিষ্যতের সুনাগরিক। এই সুনাগরিকেরাই গড়ে তুলবে উন্নত বাংলাদেশ। প্রতিটা ঘরকে শিশুর জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবা-মায়েদের প্রশিক্ষণ জরুরি। সন্তান জন্মের আগেই সন্তানের লালনপালনের বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে, বিশেষত মায়েদের। শৈশব থেকেই শিশুকে নৈতিক শিক্ষার পাঠ দিতে হবে। এক্ষেত্রে বাবা-মাকেও তা মেনে চলতে হবে। অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং মানবিক চেতনার অধিকারী হতে তাদের বাস্তব জীবনের অনুশীলন দরকার। এর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আদর্শ মানুষ গড়ার কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মানবিক চেতনাকে উজ্জীবিত করে এমন ধরনের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার বিকল্প নেই। এগুলোর মাধ্যমে শিশু-কিশোরেরা ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতের স্বপ্নকে উজ্জ্বল করে তুলতে আমাদের বাবা-মায়েরা তাদের যেন একটু সময় দেন। তাহলেই গ্যাং কালচারের এই বিপথগামী তরুণদের অপরাধমুক্ত রাখা সম্ভবপর হবে এবং আগামী প্রজন্ম রক্ষা পাবে এক অসুস্থ সমাজ থেকে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..