সম্পাদকীয়

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কেটে রেস্তোরাঁ নির্মাণ নয়

প্র্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের অস্তিত্ব ও মানবজাতির উন্নয়ন নির্ভরশীল। পরিবেশের কোনো উপাদান বা অংশের পরিবর্তন বা অবক্ষয়ের প্রভাব অন্যান্য উপাদানের ওপর পড়ে। উন্নয়নকে টেকসই রাখার জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা অপরিহার্য।

ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সব নেতিবাচক প্রভাবে দেশের ভূমি, কৃষি, পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীববৈচিত্র্য, অবকাঠামো প্রভৃতি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশ-প্র্র্রতিবেশ তথা প্রাণিকূলকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষায় সরকার কার্যকর কর্মসূচি নিচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী বিভিন্ন নিয়ামকে বাংলাদেশের ‘অবদান’ অতি নগণ্য। অথচ এর প্রভাবে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধরিত্রী বহুমাত্রিক সমস্যার সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের একটি হলেও আমরাই প্রথম নিজস্ব তহবিল দ্বারা ‘ক্ল¬াইমেট চেঞ্জ ফান্ড’ গঠন করেছি। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পদক ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দি আর্থ’ পদকে ভূষিত হয়েছেন। আমরা কোনোভাবেই বলতে পারি না, পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের কোনো শৈথিল্য আছে। এরপরও কোনো কোনো খবর আমাদের হতাশ করে।

গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সৌন্দর্য বাড়ানোর নামে গাছ কাটা বন্ধে সরকারকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। গাছ কাটার প্রতিবাদ ও আত্মপক্ষ সমর্থনে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বক্তব্য দেয়ার মধ্যে গতকাল এ নোটিস পাঠানো হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংরক্ষণে আদালতের এক আদেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে নোটিসে বলা হয়েছে, গাছ কেটে রেস্তোরাঁ নির্মাণ বন্ধ না হলে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে।

২০০৯ সালে উদ্যান-সংক্রান্ত এক রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিছক একটি এলাকা নয়। এলাকাটি ঢাকা শহর পত্তনের সময় থেকে একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ এলাকার ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত ঐতিহ্য আছে। শুধু তা-ই নয়, দেশের সব গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্র এ এলাকা। ফলে সম্পূর্ণ এলাকাটি একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে সংরক্ষণের দাবি রাখে।

যখন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গাছ লাগানো প্রয়োজন। তখন নতুন করে গাছ না লাগিয়ে নির্বিচারে গাছ কর্তন কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এমনিতেই শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে বনভূমি ক্রমেই কমছে। অবশ্য গতকালই পত্রিকান্তরে প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু গাছ কর্তন করা হলেও প্রায় এক হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’

হাইকোর্ট নির্দেশিত সাতটি স্থান ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সব ধরনের স্থাপনা অপসারণ করতে বলা হয়েছিল রায়ে। আমরা মনে করি, আদালতের নির্দেশনা মেনে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণের (তৃতীয় পর্যায়) মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। এখানে যাতে নির্বিচারে গাছ কাটা না হয়, সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..