মত-বিশ্লেষণ

স্কুল বুলিং একটি সামাজিক ব্যাধি

কাজি আফতাবুন নাহার জ্যোতি: প্রতিদিন স্কুলে সালসাবিল ছোটখাটো কোনো একটি নির্যাতনের শিকার হবেই। সহপাঠী কিংবা সিনিয়রদের মধ্যে কেউ না কেউ খুনসুটি করবেই। কেউ হয়তো তার মাথার চুল ধরে টান দেবে, কেউবা মৃদু ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে, আবার কেউ হয়তো বেঞ্চে বসতে দিয়ে তুলে দেবে। কোনোদিন হয়তো বা স্কুলের ইউনিফর্মে রঙ পেন্সিল দিয়ে এঁকে দেবে। সহপাঠীরা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবে। না পারলে মাথার পেছনে ধাক্কা মারবে। এসব নিয়ে সালসাবিল বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে নিজের ঘরে বসে থাকে। এ ব্যাপারে মা-বাবা তাকে যতই জেরা করুক নীরবতা পালন করে সালসাবিল। ছেলেবেলা থেকে সালসাবিল খুবই শান্ত প্রকৃতির। কারও সাতে-পাঁচে জড়ায় না। কুমিল্লার ডায়মন্ড হারবার হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সালসাবিল। মাঝে মধ্যে সে আর স্কুলে যাবে না, ঘরে বসে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। কিন্তু পারিবারিক চাপে তাকে সব সহ্য করে স্কুলে যেতে হয়।

সালসাবিলের বাবা রাহিম হোসেন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাবার সঙ্গে তার দেখা হয় রাতে, খাবার টেবিলে। একদিন সালসাবিলের বাবা তার ছেলের এক সহপাঠীর মাধ্যমে এ সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারে। তারপর স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বিষয়টি সুরাহা হয়।

সালসাবিলের মতো অনেক শিশু এরকম পরিস্থিতির শিকার হয়। দেশের প্রায় স্কুলে শিশুদের আচরণগত বৈষম্য রয়েছে। কাউকে মানসিক বা শারীরিকভাবে হেনস্তা করা, অপমান অপদস্থ করা, সবার সামনে হেয় করা ইত্যাদি কাজ মূলত বুলিং। কোনো কোনো সময় কাউকে অপদস্থ করে মজা করাও বুলিং হিসেবে পরিচিত। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের স্কুলগুলোয় ইদানীং বুলিং গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, যারা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সক্রিয়। মাদরাসা, স্কুল, কিন্ডারগার্টেন সব জায়গায় চলছে এ ধরনের সামাজিক অপরাধ। এর কারণে অনেক কোমলমতি শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বুলিংয়ের মাধ্যমে এক বা একদল শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দে মেতে উঠছে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুলভীতি থেকে শুরু করে ঝরে পড়ছে এমনকি কখনও কখনও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক (শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে ওপরের ক্লাসগুলোয় বুলিং বেশি লক্ষ্য করা যায়। স্কুলের অভ্যন্তরেই বুলিং গ্যাংগুলো তৈরি হচ্ছে। বুলিং গ্যাং নির্দিষ্ট একজনকে টার্গেট করে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে থাকে। প্রতিটি স্কুলেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিত্যদিন শান্তশিষ্ট, দুর্বল চিত্তের ও শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত ও টিজিং করতে দেখা যায়। এ বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের কাউন্সেলিং প্রয়োজন। তা না হলে ইচ্ছে থাকলেও হয়তো এ কাজ থেকে তাদের বিরত রাখা যাবে না।’

মানুষের ব্যক্তিত্বের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে শিশুকাল থেকে। পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে গড়ে ওঠে মানবজীবনের নানা ধরনের বৈশিষ্ট্য। একজন শিশুর আনন্দময় শৈশবই উপহার দিতে পারে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। এই চিরন্তন সত্যের ফাঁকে শিশুর জীবনে প্রভাব পড়ে নানামুখী চাপ। বাংলাদেশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের এক গবেষণা রিপোর্টে জানা যায়, ৭২ শতাংশ শিশু শৈশবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। বর্তমানে সাইবার বুলিংও শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া পাঁচ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে ২৯ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ শিশু প্রতিনিয়ত দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কমিউনিটি বা সামাজিক কারণেও ভায়োলেন্স সংঘটিত হতে পারে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যা একটি সার্বজনীন ব্যাপার। শিশুরা তাদের বয়সভেদে স্বভাবগত কিছু আচরণ সুষ্ঠুভাবে না করতেই পারে। তাছাড়া বিভিন্ন পরিবার, পরিবেশ ও অবস্থা থেকে উঠে আসা বিভিন্ন শিশুর একই ধরনের আচরণ কিংবা সর্বদাই সদাচরণ আশা করা সমীচীন নয়। তাই বলে বিকৃত ধরনের আচরণও কাম্য নয়।

বুলিং সমাজে ভয়াবহ সমস্যার রূপ নিচ্ছে। এর সমাধান ও প্রতিকার না করা হলে শিশু, কিশোর ও যুবসমাজ সুশৃঙ্খল জীবনের বলয় থেকে ছিটকে পড়বে। জড়িয়ে পড়বে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। শিশুদের ক্ষেত্রে বুলিং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে বুলিংয়ের শিকার হয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বুলিং সমস্যার প্রতিকার খুবই কঠিন। কারণ যারা বুলিং ঘটিয়ে থাকে তারাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরী। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা মুশকিল হয়ে পড়ে। তবে শাস্তির পরিবর্তে স্কুলে শিক্ষাদানের পাশাপাশি গুরুত্ব সহকারে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই উত্তম পন্থা। তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে, একটু আনন্দ উপভোগ করতে সহপাঠী বা সমবয়সীদের কাউকে হেয় করা উচিত নয়। কেবল শিক্ষক নয়, পরিবার থেকে প্রত্যেকটি শিশুকে সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে।’

শিশুরা বেশিরভাগ সময় আরও নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে শিক্ষক কিংবা অভিভাবকদের কাছে বিষয়টি গোপন করে। যার কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, বুলিং চলতে থাকে। স্কুল বুলিং প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ চলছে। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি বুলিং প্রতিকারে কঠোর আইন প্রয়োগের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। বুলিং প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে খসড়া আইনটি জাতীয় সংসদে পাশ হলে এর উপযুক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাবে। ওই আইন অনুযায়ী বিদ্যালয় চলাকালীন বা বিদ্যালয় শুরু হওয়ার আগে বা ছুটির পরে শ্রেণিকক্ষে বা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বা বাইরে কোনো শিক্ষার্থী কর্তৃক একক বা দলগতভাবে অন্য কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করা, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা, অশালীন বা অপমানজনক নামে ডাকা, অসৌজন্যমূলক আচরণ করা, কোনো বিশেষ শব্দ বারবার ব্যবহার করে উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করা স্কুল বুলিং হিসেবে গণ্য হবে। খসড়া আইনে তিন ধরনের বুলিংয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। যথাÑকাউকে কোনো কিছু দিয়ে আঘাত করা, চড়-থাপ্পড়, লাথি ও ধাক্কা মারা, থুথু নিক্ষেপ, জিনিসপত্র জোর করে নিয়ে যাওয়া বা ভেঙে ফেলা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করা ‘শারীরিক বুলিং’। উপহাস করা, খারাপ নামে সম্বোধন করা ও অশালীন শব্দ ব্যবহার ও হুমিক ‘মৌখিক বুলিং’ এবং সামাজিক স্ট্যাটাস, ধর্মীয় পরিচিত বা বংশগত অহংবোধ থেকে কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, কারও সম্পর্কে গুজব ছড়ানো এবং প্রকাশ্যে অপমান করা হলো ‘সামাজিক বুলিং’। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে সরকারি, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল বুলিংয়ের প্রবণতা বেশি পরীলক্ষিত হয়। এতে শিখন কার্যক্রম ব্যাহত হয়, বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিনষ্ট হয়। যদিও স্কুল বুলিং সাধারণত ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয় না, তবে দৃশ্যত সে রকম কিছু ঘটলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, কর্মস্থল বা অন্য কোথাও যখনই কেউ বুলিংয়ের শিকার হবে, শুরু থেকেই তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং তার প্রতিবিধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বুলিং একটি সাধারণ ঘটনা হলেও তা শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বুলিংয়ের ব্যাপারে সচেতন এবং সোচ্চার হওয়া দরকার প্রত্যেকের। শিশুরা যেন এর শিকার না হয় তার জন্য যেখানেই বুলিং হবে, সেখানেই প্রতিরোধ করা জরুরি। বুলিংয়ের কারণে শিশু তার সামাজিক বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। ফলে তার মধ্যে হতাশা, নৈরাজ্য ও অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে, যা কোনোভাবেই কারও কাম্য নয়।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..