Print Date & Time : 17 April 2021 Saturday 3:11 am

স্ক্র্যাপ সংকটে রড উৎপাদনে ভাটা

প্রকাশ: January 14, 2021 সময়- 11:20 pm

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চলমান করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ইস্পাতশিল্পের প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটের কারণে গত দুই মাসের ব্যবধানে কাঁচামালটির টনপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার টাকা। দাম বৃদ্ধি এখনও অব্যাহত। কাঁচামাল সংকটের কারণে ইস্পাত কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ক্রেতার চাহিদা অনুসারে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান রড ও অন্যান্য ইস্পাত পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে আমদানিকৃত জাহাজ থেকে প্রাপ্ত স্ক্র্যাপের টনপ্রতি দাম ছিল ৪০০ ডলার। কিন্তু সংক্রমণের পর এপ্রিল থেকে এটির দাম কমতে থাকে। নভেম্বর থেকে ফের স্ক্র্যাপের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু সে অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় পণ্যটির দাম বাড়তে থাকে। গত দুই মাসে টনপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রি-সাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি মাসে পুরোনো জাহাজভাঙা হয়েছিল ২০টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১, মার্চ মাসে ১৮টি এবং মে মাসে মাত্র পাঁচটি, জুন মাসে ১৪টি, জুলাই মাসে ১১টি, আগস্ট মাসে ছয়টি, সেপ্টেম্বরে ১৩টি, অক্টোবরে ২০টি, নভেম্বর মাসে ৯টি এবং ডিসেম্বর মাসে আটটি। আর এপ্রিল মাসে কোনো জাহাজভাঙা হয়নি। সব মিলিয়ে গত বছরের মোট জাহাজ আমদানি হয়েছে ১৪৫টি। এর আগের বছরের মোট ২০৬টি জাহাজ আমদানি করা হয়েছিল। অর্থাৎ করোনার প্রভাবে জাহাজ আমদানি কমেছে ৬১টি। ২০১৮ সালে ২১৫টি জাহাজ আমদানি হয়েছিল। পুরোনো জাহাজ আমদানি কমে যাওয়ায় স্ক্র্যাপের সংকট দেখা দিয়েছে।

এ খাতের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ২০-২৫টি পর্যন্ত পুরোনো জাহাজ আনা হতো। কিন্তু করোনা শুরু হওয়ার পর দাম ও চাহিদা কমে যাওয়ায় পুরোনো জাহাজ আমদানি কমে গিয়েছিল। আবার হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অথচ করোনা সংক্রমণের প্রথমদিকে স্ক্র্যাপের দাম কমে যাওয়ায় জাহাজ কাটায় কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়েছিল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম কমে যাওয়ায় স্থানীয় ইস্পাত কারখানাগুলো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে না কিনে সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানিও করছে। এতে কারখানাগুলোর খরচ কম পড়ছে। তবে ইয়ার্ড মালিকরা লোকসানে পড়ছেন।

খাতবিশ্লেষকরা বলেন, করোনার কারণে ইস্পাতের দাম বেড়েছে। কিন্তু বিক্রি সে অনুপাতে বাড়েনি। এটা সাময়িক ব্যাপার। আর জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণকারী ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা বুঝে উঠতে পারেননি। ফলে তারাও তেমন সুযোগ নিতে পারেননি। অথচ জাহাজভাঙা শিল্পে শীর্ষে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশে পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপইয়ার্ড আছে মাত্র একটি। এ খাতের ব্যবসায়ীরা যদি গ্রিন শিপইয়ার্ড এবং কর্মপরিবেশ ভালো মনোযোগী হন, তাহলে এ খাতের আরও ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ইস্পাত খাতের শীর্ষ কোম্পানি বাংলাদেশ স্টিল রি-রোরিং মিলস (বিএসআরএম) লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলী হুসেন আকবর আলী শেয়ার বিজকে বলেন, ইস্পাতের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় দ্বি-গুণ হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতিটন ৫০০ ডলার করে আমদানি করছি। করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে যা ছিল ২৬০ ডলারের মতো। আমাদের স্ক্র্যাপ আমদানি অব্যাহত আছে। আর উৎপাদনও শতভাগ চালু আছে। চীনে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী ক্র্যাপের দাম বেড়েছে। কবে নাগাদ দাম কমবে তা বলা মুশকিল।

অন্যদিকে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, গত নভেম্বর থেকে স্ক্যাপ সংকটের কারণে দাম বেড়েছে। এখনও স্ক্র্যাপের সংকট চলছে। এমনকি লোকাল স্ক্যাপও টনপ্রতি ৪২ থেকে ৪৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কবে নাগাদ দাম কমবে, তা বোঝা যাচ্ছে না।

পুরোনো জাহাজ আমদানি কম হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সাবেক সহসভাপতি এবং আরেফিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ কালাম উদ্দিন বলেন, মূলত করোনা শুরু হওয়ার পর দাম অনেক কমে গিয়েছিল। আবার মিলগুলোতে তেমন চাহিদা ছিল না। ফলে ক্র্যাপ বিক্রি তো বন্ধ ছিল। হয়তো কেউ কেউ টাকার প্রয়োজনে লোকসান দিয়ে বিক্রি করছে। এখন তো আন্তর্জাতিক বাজারের বুকিং রেটও প্রায় ৫০০ ডলার।