দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহক মাওলানা ডেভেলপমেন্ট

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ মাওলানা। ব্যবসার প্রয়োজনে গ্রুপটির বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক জুবিলী রোড শাখা থেকে। এর মধ্যে আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান মাওলানা ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড খেলাপি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির সুদাসলসহ খেলাপি পাওনা আট কোটি ৮৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪৮ টাকা।

এ পাওনা আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিলামে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক জুবিলী রোড শাখা সূত্রে জানা যায়, গ্রুপটির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাওলানা অ্যান্ড সন্স, মাওলানা ফিলিংস অ্যান্ড সিঅ্যান্ডজি ওয়ার্কস, মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (এমডিসি), মুকুট এন্টারপ্রাইজ এবং আল হেরা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক জুবিলী রোড শাখা একাধিক ঋণ সুবিধা নেয়। আর এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩১ কোটি টাকার মতো। সঙ্গে অনারোপিত সুদ যুক্ত হলে মোট ঋণের পরিমাণ হবে ৪০ কোটি টাকার মতো। একসময়ে এ গ্রুপের ব্যবসা ছিল চাঙা। কিন্তু পারিবারিক অনৈক্য ও ক্রমাগত লোকসানে ডুবে মাওলানা গ্রুপ।

এর মধ্যে আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান মাওলানা ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড খেলাপি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে গত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির সুদাসলসহ খেলাপি পাওনা আট কোটি ৮৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪৮ টাকা। আর ঋণের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির হালিশহর থানায় আগ্রাবাদ মৌজায় এমডিসি পোর্টভিউ অ্যাপার্টমেন্টে সুরমা দালানে ১৮টি ফ্ল্যাট, তিতাস দালানে ২০টি এবং হালদা দালানে ১৯টি ফ্ল্যাট অর্থাৎ মোট ৫৭টি ফ্ল্যাট। এসব ফ্ল্যাটে আয়তন প্রায় ৬৫ হাজার বর্গফুট। আর ৩৭টি গাড়ি পার্কিং স্পেসসহ ভবনগুলো ছাদ, যাতায়াতের পথ, সিঁড়ি ইত্যাদি। আর খেলাপি পাওনা আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিলামে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আগামী ৮ অক্টোবর ব্যাংকটির জুবিলী রোড শাখায় অনুষ্ঠিত হবে। এতে আগ্রহী ক্রেতারা অংশ গ্রহণ করতে পারবেন।

একাধিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামে রড-সিমেন্ট ব্যবসায় আসেন আগ্রাবাদের মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ। নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ খাতে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করেন তিনি। নিজের বার্ধক্যের কারণে ১৯৯৩ সালে ব্যবসার হাল তুলে দেন তার ছেলেদের ওপর। বাবার অর্জিত সম্পদ ও সুনাম কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্র্রসারণ করেন তৈয়ব উল্লাহর পাঁচ ছেলে।

মাওলানা অ্যান্ড সন্সের সুনামের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ঋণ সুবিধা পান তারা। এরপর মাওলানা অ্যান্ড সন্স থেকে ‘মাওলানা গ্রুপ’ নাম দিয়ে গড়ে তোলেন মাওলানা পাওয়ার প্লাস প্রাইভেট লিমিটেড, মাওলানা ফিলিংস অ্যান্ড সিঅ্যান্ডজি ওয়ার্কস, আল হেরা, মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (এমডিসি), এমএফসি (রেস্টুরেন্ট), মুকুট এন্টারপ্রাইজ, মাওলানা ফিশারিজ অ্যান্ড ফার্মস লিমিটেড, রাজমুটুক কমিউনিটি সেন্টার, মাওলানা লজিস্টিক অ্যান্ড শিপিং ও মাওলানা ফার্নিচার।

কয়েক বছর ভালো ব্যবসা হলেও পারিবারিক অনৈক্য ও ক্রমাগত লোকসানে ডুবতে থাকে মাওলানা গ্রুপের ব্যবসা। আর বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই বন্ধ। গ্রুপটির একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান এমডিসিও বন্ধের পথে।

এদিকে ক্রমাগত লোকসানের ফলে গ্রুপটির পরিচালক অর্থাৎ ভাইদের মধ্যে অনৈক্য বাড়ে। এতে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে আর কেউ এগিয়ে আসেননি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ২০০ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এএইচএম শোয়েব বিদেশে পালিয়ে গিয়ে বিপাকে ফেলেছেন অন্যান্য ভাইদের।

ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মা-বাবা মারা যাওয়ার পর পাঁচ ভাই মিলে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হলে ভাইদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় ভাইয়েরা একসঙ্গে থাকলেও ঋণ পরিশোধের বেলায় কেউ এগিয়ে আসছেন না। বিশেষ করে গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকা এএইচএম শোয়েব আমেরিকায় চলে যাওয়ায় ঋণের টাকা ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাদের জিলানীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক জুবিলী রোড শাখা ব্যবস্থাপক আবু হেনা নাজিম উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের শাখায় মাওলানা গ্রুপের মাওলানা অ্যান্ড সন্স, মাওলানা ফিলিংস অ্যান্ড সিঅ্যান্ডজি ওয়ার্কস, মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (এমডিসি), মুকুট এন্টারপ্রাইজ এবং আল হেরা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ঋণ আছে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩১ কোটি টাকার মতো। সঙ্গে অনারোপিত সুদ যুক্ত হলে মোট ঋণের পরিমাণ হবে ৪০ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে তাদের আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান মাওলানা ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের কাছে সুদাসলসহ খেলাপি পাওনা আট কোটি ৮৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪৮ টাকা। যদিও এ গ্রুপের অন্যান্য ঋণের বিপরীতে ভালো সিকিউরিটিজ নেই। তাই এটা দিয়ে সবগুলোর পাওনা আদায়ে চেষ্টা করব। তবে তারা এটা হয়তো পেমেন্ট দিতে চাইবে। যদিও তারা রি-শিডিউলের জন্য চেষ্টা করলেও কাগজপত্র ও অন্যান্য জটিলতা থাকার কারণে আর হয়নি।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..