প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

স্থায়ী আমানতের চেয়ে বেশি মুনাফা ১৮ ব্যাংকের শেয়ারে

ব্যাংকের সুদহার কমতে থাকায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে পুঁজিবাজারে। উচ্চ লভ্যাংশের হার দেখে অনেকে প্রভাবিতও হচ্ছেন। তবে এসব শেয়ারের প্রকৃত মুনাফার বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন না অনেকেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই বিভিন্ন কোম্পানির প্রকৃত মুনাফাচিত্র তুলে ধরতে ধারাবাহিক আয়োজন। আজ ছাপা হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব

 

ইসমাইল আলী ও নাজমুল ইসলাম ফারুক: ব্যাংক আমানতের সুদহার তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এতে বেশিরভাগ ব্যাংকের সুদহার ছয় শতাংশ বা তার নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে এক বছরমেয়াদি স্থায়ী আমানতে ছয় শতাংশ সুদ দিচ্ছে ব্যাংক এশিয়া। আর ২০১৫ সালের সমাপ্ত বছরে ব্যাংকটির শেয়ারে প্রকৃত মুনাফা (ইল্ড) দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এদিকে ইসলামী ব্যাংকের এক বছরমেয়াদি স্থায়ী আমানতে সুদহার পাঁচ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর ব্যাংকটির ইল্ড সাত দশমিক ১৯ শতাংশ।

ব্যাংক এশিয়া বা ইসলামী ব্যাংকই শুধু নয়, তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৮টির ক্ষেত্রে একই অবস্থা। এসব ব্যাংকের ইল্ড হার স্থায়ী আমানতের সুদহারের চেয়ে বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারমূল্য কম হওয়াই ব্যাংকের ইল্ড বেশি হওয়ার মূল কারণ। গত দুবছরে বেশিরভাগ ব্যাংকে শেয়ারই ফেসভ্যালুর কাছাকাছি বা নিচে ছিল। ফলে সাধারণ লভ্যাংশ দিলেও ব্যাংকের শেয়ারে উচ্চ ইল্ড বা মুনাফা মিলেছে। তবে শেয়ারদর বেড়ে গেলে বা ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়ার হার কমলে আগামীতে এ চিত্র পরিবর্তন হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
ইয়াহু ফাইন্যান্সের ভাষ্যমতে, কোনো কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের আয়ের যে অংশ দেয়, তা হলো লভ্যাংশ। এটি সাধারণত শেয়ারপ্রতি আয় প্রকাশ করে। তবে বিভিন্ন কোম্পানির লভ্যাংশের হারের মধ্যে তুলনায় ব্যবহার করা হয় ইল্ড বা প্রকৃত মুনাফা। এক্ষেত্রে লভ্যাংশকে শেয়ারমূল্য দিয়ে ভাগ করে প্রকৃত মুনাফা নির্ণয় করা হয়। শেয়ারমূল্য বেশি হলে আর লভ্যাংশ কম দেওয়া হলে ইল্ড নিম্নমুখী হয়।
ইল্ডের গ্রহণযোগ্য কোনো হার না থাকলেও বাজারের অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে তুলনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইয়াহু বিজনেস। তবে মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক সুদহারের চেয়ে ইল্ড বেশি হওয়া উচিত বলেই মত সংস্থাটির।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যমতে, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ইল্ড যমুনা ব্যাংকের। ২০১৫ সালের সমাপ্ত হিসাববছর শেষে ব্যাংকটি ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। আর গত দুবছর যমুনা ব্যাংকের শেয়ার ৯ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৯০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করে। বর্তমানে ব্যাংকটির ইল্ড ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। যদিও ব্যাংকটির স্থায়ী আমানতের সুদহার মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ।
উচ্চ আয়ের দিক থেকে এ খাতে পরের অবস্থানে রয়েছে এনসিসি ব্যাংক। ২০১৫ সালের সমাপ্ত বছরে ব্যাংকটির ইল্ড দাঁড়ায় ১৪ দশমিক শূন্য এক শতাংশ। আর ব্যাংকটির এক বছরমেয়াদি সুদহার সর্বোচ্চ সাড়ে ছয় শতাংশ। এদিকে এক্সিম ব্যাংকের ইল্ড ১৩ দশমিক ৯৫। আর ব্যাংকটির আমানতের সুদহার ছয় শতাংশ। গত দুবছরে এক্সিম ব্যাংকের শেয়ার সাত টাকা ৬০ পয়সা থেকে ১১ টাকা ৯০ পয়সায় লেনদেন করা হয়।
বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেডা) চেয়ারম্যান এবং মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ নুরুল আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজারে কোনো গ্রাহক বিনিয়োগ করে আবার ব্যাংকে ডিপোজিটও রাখতে পারেন। দুটি দুই ধরনের বিনিয়োগ। একজন গ্রাহক সব সময়ই ভালোটাই চান। তার আগে গ্রাহককে মার্কেট স্টাডি ও ফান্ডামেন্টাল দেখতে হবে। এ বছর পুঁজিবাজার ভালোর দিকে রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকের শেয়ার ও অন্যান্য দিক ভালো আছে। যদি ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যান্য সেক্টর একইভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের হাত পুড়বে না।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের অর্থ রাখার বিষয়টি মোস্ট লিকিউট। একজন গ্রাহক চাইলেই তা পান। সে সঙ্গে পুঁজি হারানোর ভয় থাকে না। তবে পুঁজিবাজারে প্রকৃত মুনাফার হার বেশি। ব্যাংকের মুনাফার হার আগামীতেও বাড়ার সম্ভাবনা নেই। তাই আগামীতে অনেকেই ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।
তথ্যমতে, ১০ শতাংশের বেশি ইল্ড রয়েছে আরও চার ব্যাংকে। এগুলো হলো- সিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)। ব্যাংক চারটির ইল্ড হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ৭৮, ১১ দশমিক ৩৬, ১১ দশমিক ২১ ও ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর এসব ব্যাংকের মেয়াদি আমানতের সুদহার যথাক্রমে সাড়ে পাঁচ, সাড়ে সাত, পাঁচ ও ছয় শতাংশ।
আমানত সুদহার ও লভ্যাংশ ইল্ডের মধ্যে সবচেয়ে কম পার্থক্য ব্র্যাক ব্যাংকের। ২০১৫ সালের সমাপ্ত হিসাববছর শেষে ব্যাংকটি ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। আর গত দুবছর ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ার ৩৭ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৬৭ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করে। এতে ব্যাংকটির ইল্ড দাঁড়ায় পাঁচ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর ব্যাংকটির স্থায়ী আমানতের সুদহার গড়ে চার দশমিক ৭৫।
এদিকে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ২০১৫ সালের সমাপ্ত হিসাববছর শেষে ইল্ড ছিল ছয় দশমিক ৮০ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকটির এক বছরমেয়াদি আমাতনের সুদহার ছয় শতাংশ। এর বাইরে ইস্টার্ন ব্যাংকের আমানতের সুদহার চার ও ইল্ড হার ছয় দশমিক ৯৯, ওয়ান ব্যাংকের সাড়ে পাঁচ ও আট দশমিক ১৭, প্রাইম ব্যাংকের পাঁচ ও আট দশমিক ২৯, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সাড়ে পাঁচ ও ৯ দশমিক ৬৩, সাউথইস্ট ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ৭৫ ও আট দশমিক ৫২, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের পাঁচ দশমিক ২৫ ও ৯ দশমিক ৩৯ এবং উত্তরা ব্যাংকের চার দশমিক ৭৫ ও আট দশমিক ৮১ শতাংশ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অন্যান্য খাতের চেয়ে ব্যাংকিং খাতের ডিভিডেন্ড ইল্ড রেট ভালো। কারণ বর্তমানে ব্যাংকের শেয়ারদর অনেক কম। অনেকগুলো দর ফেসভ্যালুর নিচে নেমে গেছে। তবে বাজার উঠতির দিকে থাকায় সমাপ্ত ২০১৬ সালে ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা করেছে। এতে আগামীতে ব্যাংকের শেয়ারদর বাড়তে থাকলে ইল্ডের পরিমাণ কমতে থাকবে। তাই ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে নগদ লভ্যাংশ দেয়নি সাতটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো: এবি ব্যাংক, আইএফআইসি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। ফলে এসব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের মিলবে না কোনো ইল্ড বা প্রকৃত মুনাফা। এছাড়া লোকসানে থাকায় আইসিবি ইসলামী ব্যাংক গত বছর কোনো মুনাফা দেয়নি। আর তালিকাভুক্ত চারটি ব্যাংকের সুদহারের নিচে পড়ে গেছে ইল্ড হার। এগুলো হলো: ঢাকা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা, পূবালী ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক।