মত-বিশ্লেষণ

স্থূলতা একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা

চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ: শায়ানের বয়স পাঁচ বছর। বয়সের তুলনায় আস্বাভাবিক মোটা। শায়ানকে দেখে তার সঠিক বয়স নির্ধারণ করা মুশকিল। তার বয়সী একটি স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ওজন শায়ানের। সে স্বাভাবিক শিশুর মতো খেলাধুলা করতে ও দৌড়াতে পারে না। একটু হাঁটা-চলা করলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সমবয়সী তার বন্ধুও নেই তেমন। মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। বাসায় কার্টুন দেখা ও কম্পিউটারে গেমস খেলে সময় কাটে তার।

শায়ানের বাবা-মা দুজনেই ভালো চাকরি করেন। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকায় বাবা-মা নিয়মিত বাইরের খাবার খাওয়ান শায়ানের। ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি শায়ানের। অতিমাত্রায় পুষ্টি এবং অপুষ্টি দুটোই শিশুর জন্য ক্ষতিকর এ বিষয়টি অনেক শিক্ষিত বাবা-মাও বুঝতে চান না। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষই নয়, অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিও মনে করেন, মোটা শিশু মানেই স্বাস্থ্যবান শিশু। সুস্বাস্থ্য আর স্থূলতা এক নয়, এটা অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। স্থূলতা ও শিশুর মুটিয়ে যাওয়া একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা।

আমাদের দেশে অনেক মা-বাবাই শিশুর জীবনের প্রথম দিকে ওজন বৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু তারা অনেকেই তাদের শিশুর অত্যধিক ওজন বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ে চিন্তা করেন না। একটি শিশুর বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম এবং ওজন অনেক বেশি থাকাকে ওবিসিটি বা শিশুর স্থূলতা বলা হয়। শৈশবকালীন স্থূলতা যদি পরিণত বয়সেও থেকে যায় এবং চিকিৎসা করানো না হয়, তাহলে তাদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এছাড়া স্থূল শিশুদের শারীরিক আকৃতি তার মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সে হতাশা ও হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকে। চরম হতাশার কারণে তার মধ্যে আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়।

শিশুরা অনেক কারণে স্থূলতায় ভুগতে পারে। এর মধ্যে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ফাস্টফুডে আসক্তি, সফট ড্রিংকস ও চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া অন্যতম কারণ। আবার কখনও কখনও হরমোনের কারণেও শিশুদের স্থূলতায় ভুগতে দেখা যায়। মায়ের স্থূলতায় এবং মাতৃত্বকালীন সঠিক খাবার গ্রহণ না করার কারণেও শিশুকে স্থূলতায় ভুগতে দেখা যায়। একটা শিশুর শৈশবকালে ওজন কত হবে, সেটা নির্ভর করে সে কতটুকু পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ করছে এবং কতটুকু পরিমাণে ব্যয় করছে তার ওপর। আজকাল দেখা যায়, শিশুরা দিনের অনেকটা সময়ে ঘরে বসে টিভি, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ নিয়ে গেমস খেলে এবং এটা-সেটা খেতেই থাকে। এতে তাদের আস্তে আস্তে ওজন বাড়তে থাকে। শিশুর এ খাদ্যাভাস তৈরিতে পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খেতে অভ্যস্ত এবং ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত, তাদের মধ্যে স্থূলতা ও অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে বংশগত বা হরমোনজনিত কারণেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যা যে কোনো বয়সেই দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত ছোটবেলাতেই এই সমস্যার লক্ষণ দেখা দেয়। তাই কোনো শিশুর মাঝে অতিরিক্ত স্থূলতাজনিত সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। পরিমিত সুষম খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশুর এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিদের মতে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা দেশে নতুন জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর কারণে ডায়াবেটিস, হƒদরোগ, উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি ও স্ট্রোক বাড়ছে। শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কম ওজন, স্বাভাবিক ওজন, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতাÑএই চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূল শিশুদের ৭০ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। বাকি ৩০ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এতে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের শিকার এবং স্থূলতায় ভোগা শিশুর সংখ্যা ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে কম রংপুরে বিভাগে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ও স্থূল শিশুদের ৮০ ভাগ সপ্তাহে চারবারের অধিক শিঙাড়া, সমুচা, চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু, পিৎজা, স্যান্ডুইচ, বার্গার, ফ্রাইড চিকেন বা এ ধরনের ফাস্টফুড খেয়ে থাকে। এর সঙ্গে কোমল পানীয়ও রয়েছে। শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূল শিশুর সংখ্যা বেশি। এছাড়া শহরের স্কুল বা বাড়ির আশেপাশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় শিশুরা মুটিয়ে যাচ্ছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পারিবারিক সহযোগিতা হলো স্থূল শিশুদের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। স্থূল শিশুদের ওজন কমানোর ডায়েট দেয়া যাবে না। কারণ ওজন কমানোর ডায়েট দিলে তাদের শারীরিক উচ্চতা বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঠিকমতো হবে না। তাদের খাদ্য গ্রহণে পরিবর্তন আনতে হবে এবং সুনিয়ন্ত্রিত সক্রিয় জীবন-যাপনে উৎসাহিত করতে হবে। স্থূল শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে এবং অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে;  অধিক পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল, শস্যজাতীয় খাবার দিতে হবে; কম ফ্যাটযুক্ত খাবার দিতে হবে। একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার দিতে হবে; পরিমিত পরিমাণে পানি খেতে হবে; চিনিজাতীয় খাবার ও কোমল পানীয় খাওয়া বাদ দিতে হবে; অত্যধিক ফ্যাট বা ক্যালরিযুক্ত খাবার, যেমন পিৎজা, হটডগ, স্যান্ডুইচ, বার্গার, ফ্রাইড চিকেন বাদ দিতে হবে এবং বেশি লবণাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতাবিধি, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষা-সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। যৌথভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের করা মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) প্রগতির পথে বাংলাদেশ, ২০১৯-এর ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে। শৈশবকালীন খর্বাকৃতির নিম্নগামী হার এর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক উন্নতিগুলোর একটি, যা ২০১৩ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশে গত দুই দশকে সব ধরনের শিশুমৃত্যুর হার (প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী, নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী) নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।

এছাড়া অন্যান্য ইতিবাচক ফলাফলের মধ্যে রয়েছে, বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রাপ্যতা; টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ ও ব্যবহারের হার বৃদ্ধি; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি এবং জন্ম নিবন্ধনের সংখ্যা বৃদ্ধি, যা একটি শিশুর পরিচয়ের অধিকার নিশ্চিত করে। একটি সমৃদ্ধ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখার জন্য আমাদের সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষা ও খাবার পানির গুণগত মান বৃদ্ধি, শিশুবিয়ের বিরুদ্ধে লড়াই এবং শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো বিষয়গুলো মোকাবিলায় সরকার ব্যাপকভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য বাংলাদেশের আরও  দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

শিশুসহ সব বয়সী মানুষকে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার কোনো বিকল্প নেই বলে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। শিশুদের স্কুলের মাঠে বা পার্কে নিয়মিত খেলতে দিতে হবে। প্রতিদিন হাঁটাচলারও পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়াম করাতে হবে। শহরের পার্কগুলো সাধারণের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা এবং নতুন পার্ক ও খেলার জায়গা তৈরি করতে হবে। শিশুরা যেন বেশি সময় ধরে টেলিভিশন না দেখে অথবা ভিডিও গেমস না খেলে, সে ব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ও সুস্বাস্থ্য গঠনে অত্যন্ত আন্তরিক। শিশুর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। কায়িক পরিশ্রমের খেলাধুলা শিশুদের স্থূলতা ও মুটিয়ে যাওয়া রোধে সবচেয়ে কার্যকর। এজন্য প্রয়োজন খেলার মাঠ। এ লক্ষ্যে সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের উপযোগী করে স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনেও সরকার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

সুস্থ-সবল সন্তান প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছেই কাম্য। তাই সন্তানকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে হলে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটা, খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়াম করাতে হবে। বাবা-মায়ের সচেতনতা শিশুকে সুস্থ ও সবল রাখতে পারে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..