সাক্ষাৎকার

স্বতন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর এয়ারপোর্ট এপিবিএন গঠন সময়ের দাবি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারে ২০১০ সালে গঠন করা হয় এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এএপি)। এ সময়ের মধ্যেই আমূল পরিবর্তন এসেছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। বিমানবন্দরকে যে কোনো ধরনের চুরি, ছিনতাই, ভিক্ষুক ও প্রতারকমুক্ত করার পাশাপাশি যাত্রী হয়রানি বন্ধে দিন-রাত ঘাম ঝরিয়েছে এপিবিএন। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি এসব বিষয়ে বিমানবন্দর এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন শিমুল মুখোমুখি হয়েছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হামিদুর রহমান

শেয়ার বিজ: বিমানবন্দরে এপিবিএন কি ধরনের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে?
আলমগীর হোসেন শিমুল: এপিবিএন একটি বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশপ্রধানের (আইজিপি) নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলিট ও প্যারামিলিটারি ফোর্স। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ফিজিক্যাল সিকিউরিটি দেওয়া এপিবিএনের উল্লেখযোগ্য কাজের অন্যতম। সে লক্ষ্যেই ২০১০ সালে এয়ারপোর্ট এপিবিএন গঠন করা হয়েছে। এখানে এপিবিএন তিন ধরনের নিরাপত্তা দিচ্ছে: ১. ফিজিক্যাল সিকিউরিটি, যার আওতায় বিমানবন্দরের রানওয়ে, অপারেশন টাওয়ার, রাডার স্টেশন, মার্কার, ভিওআর, লোকালাইজার, গ্লাইডপাথসহ সব ধরনের এয়ারক্রাফট ও আমদানি-রফতানি পণ্য রয়েছে। পুরো স্থাপনার সার্বিক নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোই আমাদের প্রথম কাজ।
২. যাত্রী নিরাপত্তা: বিমানবন্দর একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানে প্রয়োজন ছাড়া অযথা অনেক ধরনের মানুষ আসে, যাদের মধ্যে অনেকের অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। তাদের প্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি বিমানবন্দরে টোকাই, ভিক্ষুক প্রবেশ ঠেকানো এবং যাত্রীদের বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তি বন্ধের পাশাপাশি যাত্রীসাধারণের লাগেজ কেটে চুরি বন্ধেও আমরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।
৩. জেনারেল পুলিশিং: উপরোক্ত কাজ ছাড়াও আমরা জেনারেল পুলিশিং করে থাকি, যা আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। কেউ ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে তাকে আটকানো ও চোরাচালান বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা এয়ারক্রাফট বা বন্দরে কেউ হট্টগোল করতে চাইলে তাকে প্রতিহত করা।
শেয়ার বিজ: বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় এপিবিএনের চ্যালেঞ্জ কী?
আলমগীর হোসেন শিমুল: আমাদের চ্যালেঞ্জ ছিল পুরো বিমানবন্দরকে সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা। যেটি করা হয়েছে, অর্থাৎ এখন পুরো বিমানবন্দর সিসি ক্যামেরার আওতার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের আগেও ক্যামেরা ছিল, তবে কিছু কিছু ক্যামেরা দিয়ে আমরা কাভার করতে পারতাম না। বর্তমানে ভেহিক্যাল স্ক্যানার থেকে শুরু করে রেকর্ডিংসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে সব ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের নিজস্ব ক্যামেরা আছে ১৫০টির মতো। এছাড়া সিভিল এভিয়েশনের সিসিক্যামেরা রয়েছে প্রায় ৩০০টির মতো। এর বাইরেও ডিজিএফআই, এনএসআই, ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমসেরও ক্যামেরা রয়েছে।

শেয়ার বিজ: নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরে বিমান ছিনতাই চেষ্টা ও পিস্তল নিয়ে অনুপ্রবেশসহ বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তাহলে কি আপনাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে?

আলমগীর হোসেন শিমুল: বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো ফ্লাইট সেফটি-বিষয়ক। অর্থাৎ, এভিয়েশন সিকিউরিটি রিলেটেড। দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে এভিয়েশন সিকিউরিটি ব্যবস্থা এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জোরদার এতটুকু বলতে পারি। কেননা, যে জায়গাগুলোতে মনিটরিংয়ে ঘাটতি ছিল, সেগুলো অনেক শক্তিশালী করা হয়েছে; এখন আর কোনো ধরনের দুর্বলতার সুযোগ নেই। আমরা সাধারণত যাত্রীর নিরাপত্তা, সহযাত্রীদের নিরাপত্তা, এখনকার সরকারি-বেসরকারি যেসব সম্পদ আছে এবং এয়ারলাইনস এগুলোর নিরাপত্তা বিষয়গুলো দেখে থাকি। আমরা যে কাজগুলো করি, সেগুলোতে গত ১০ বছরে অনেক উন্নতি করেছি। আমাদের কিন্তু তেমন কোনো ব্যর্থতা নেই যে, আমরা অপরাধীদের আটক করতে পারিনি, চুরি বা অন্য যে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে অপরাধী পালিয়ে গেছে এমনটা নেই। তবে ফ্লাইটে ঢোকার আগে যে চেকিংগুলো হয়, যেমন পাসপোর্ট চেকিং, লাগেজ স্ক্যানিং এ কাজগুলো আমরা করি না। এগুলো সিভিল এভিয়েশন করে থাকে। এ দিকটায় তাদেরও জোর দিতে হবে।

শেয়ার বিজ: গত এক দশকে কোন জায়গায় নিজেদের সফল মনে করছেন?

আলমগীর হোসেন শিমুল: সফলতা বলতে বিমানবন্দরে এখন কারও কোনো কিছু হারিয়ে গেলে বা চুরি হয়ে গেলে তার শতভাগ উদ্ধার হচ্ছে; অর্থাৎ যাত্রীদের কোনো কিছু খোয়া গেলে সেগুলো আমরা তাদের পৌঁছে দিতে পারছি। আগে বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি হতো, বিভিন্ন ধরনের প্রতারণাসহ যাত্রীরা হয়রানির শিকার হতেন। এখন আর সে ধরনের কিছু নেই।

শেয়ার বিজ: বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমদানি করা কুকুর কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

আলমগীর হোসেন শিমুল: ইংল্যান্ড থেকে আমরা আটটি কুকুর এনেছি। পর্যায়ক্রমে আরও কুকুর আনা হবে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কুকুরগুলো প্রতিনিয়তই কাজ করছে। নিরাপত্তা জোরদারে তাদের বিদেশি প্রশিক্ষক দ্বারা আরও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যে কুকুরগুলো আনা হয়েছে, এগুলো স্নিফার ডগ। এদের সাধারণত বিস্ফোরক ও মাদকের ট্রেনিং দেওয়া হয়ে থাকে। পাশাপাশি এক্সক্লুসিভ বিষয়েও টহল করানো হচ্ছে।

শেয়ার বিজ: প্রতারণা প্রতিরোধে আপনাদের সাফল্য অনেক; তারপরও এটি কমছে না। নিত্যনতুন প্রতারণা হচ্ছে, কারণ কী?

আলমগীর হোসেন শিমুল: বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ সব ধরনের তল্লাশির দায়িত্ব ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের। ইমিগ্রেশন মূলত যাত্রীদের ট্রাভেল ডকুমেন্টস চেক করে আর কাস্টমস করে বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী। অনেক সময় দেখা যায়, এ দুই ধাপকে ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারিরা অবৈধ সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু পুরো বিমানবন্দরে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে, তাই ওখানে ফাঁকি দিয়ে এলেও আমাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া কষ্টকর। আমরা এমন অবৈধ কারবারে জড়িতদের প্রায়ই ধরে ফেলি এবং কাস্টমসে সোপর্দ করে শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থা করে থাকি।

শেয়ার বিজ: অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

আলমগীর হোসেন শিমুল: একসময় বিমানবন্দর ছিল টোকাই, ভিক্ষুক, ধান্দাবাজ ও প্রতারকদের নির্বিঘœ স্থান। তারা বিমানবন্দরের পরিবেশ নষ্ট করত। বিমানবন্দরের ফুটপাতে হাঁটা যেত না এদের মলমূত্রের কারণে। অনাকাক্সিক্ষত ব্যক্তি, প্রতারক ও যাত্রী হয়রানকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে পুরো বিমানবন্দরজুড়ে আমাদের ৪০টি চেকপোস্ট আছে। পাশাপাশি পেট্রোল টিম ও গোয়েন্দা নজরদারি তো রয়েছেই। ফলে এখন তাদের উৎপাত নেই বললেই চলে। তারপরও মাঝেমধ্যে তারা ঢোকার চেষ্টা চালায়, আমাদের হাতে আটকও হয়। নিয়মিত মামলা ও মোবাইল কোর্টে সাজা পেয়ে দিন দিন তাদের সংখ্যা কমে আসছে।

শেয়ার বিজ: আপনাদের জনবল ঘাটতি কাটাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

আলমগীর হোসেন শিমুল: ঘাটতি তো আছেই। সদস্যদের ন্যূনতম ১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হচ্ছে। কাজ বেড়ে গেলে অনেক সময় ১৮ ঘণ্টাও ডিউটি করতে হয়। ভারতের ইন্ধিরা গান্ধী বিমানবন্দরে ডিআইজির নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী, অর্থাৎ সিআইএসএফ কাজ করছে। সারা ভারতের সব বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দিচ্ছে ভারতীয় পুলিশের এই বিশেষায়িত ইউনিট। অথচ আমাদের এখানে একজন এসপির নেতৃত্বে প্রায় হাজারের ওপরে লোক কাজ করছে। নিয়ম অনুযায়ী একজন এসপির দায়িত্বে সর্বোচ্চ ৭০০ জনের এক ব্যাটালিয়ন থাকে। কিন্তু এখানে বেশি চাপ নিতে হচ্ছে। তবে এখন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বতন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর এপিবিএন গঠন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এর অবসান ঘটবে।

সর্বশেষ..