প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

স্বপ্নপূরণের বাজেট

গতকালের পর…

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার সঙ্গে বেকার সমস্যাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে শিল্পকারখানা যদি আরও বাড়ে তাহলে বেকার তরুণ-তরুণীদের চাকরির সংস্থান হয়। উল্লেখ্য, শুধু সরকারের একার প্রচেষ্টায় অধিকতর চাকরির সংস্থান যেমন সম্ভব নয়, একইভাবে শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনও সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও অধিকতর উৎসাহিত করতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে এটা সত্য, বাংলাদেশে যারা বিনিয়োগ ক্ষেত্রে নিয়োজিত আছেন তাদের অনেকের আচার-আচরণ ও মন-মানসিকতা ব্যবসাবান্ধব নয়। তারা বিনিয়োগকারীদের হরহামেশা হয়রানি করতে পছন্দ করেন। এসব ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে এ কথা সত্য, যারা ব্যবসা করেন তাদের এক বিরাট অংশ নিজের টাকায় নয় বরং সরকারের টাকায়ই ব্যবসা করতে অধিকতর আগ্রহী। তাদেরও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

বাজেটে ভালো-মন্দ উভয় দিক আছে, তবে ভালো দিকটাই বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, এর বাস্তবায়ন এবং এটাকে বাস্তবায়ন করতে হলে সম্পদের জোগান দান। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না হওয়া কিংবা আবগারি শুল্ক বাদ দেওয়ায় যে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হবে, তা কীভাবে পূরণ করা যায়? এ ঘাটতি পূরণ খুব কঠিন নয়। সরকার বাহাদুর সব সরকারি কর্মচারীর বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িয়েছে এবং এ অবস্থায় আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলো যেমন সরকারি গাড়ি বা জ্বালানি বাবদ অপব্যয় কমানো, স্বর্ণ আমদানির বৈধতা দিলে তার ওপর শুল্ক ধার্যকরণ, বাড়িঘর, জমিজমা রেজিস্ট্রিকরণ বাবদ ফিস সোনালী ব্যাংকের মনোপলি ভেঙে অন্যান্য সরকারি ব্যাংকে জমা দেওয়ার রীতি চালু করা, বিদেশে যারা স্বদেশের টাকা পাচার করে বাড়িঘরের মালিক হয়েছেন তাদের ওপর করের বোঝা ও পেনাল্টি ধার্যকরণ প্রভৃতি প্রয়োজন বোধ করি। বিভিন্ন দেশে জাতীয় লটারি চালু আছে এবং এর মাধ্যমে সেসব দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অগ্নিনির্বাপণ ও সামাজিক খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বস্তুত লটারি হচ্ছে একধরনের ঐচ্ছিক বা ভলান্টারি ট্যাক্স প্রথা এবং অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেও এটি চালু আছে। মোটকথা, সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অপচয় থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি, স্বর্ণের ওপর কর ধার্য করে দুই থেকে তিনশ কোটি টাকা, নিবন্ধন সহজীকরণ বাবদ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি, লটারি বাবদ ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ সম্ভব। উল্লেখ্য, সম্পদ বা আয় আহরণের সুযোগ রয়েছে। তবে তা অর্জনের জন্য বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রয়োজন এবং যারা ব্যাংক লুট করে পাহাড়সম সম্পদের মালিক হয়েছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা জনকল্যাণে কাজে

লাগানো প্রয়োজন।

বাজেট আলোচনায় যারা অর্থমন্ত্রীকে হেয় করার জন্য আদাজল খেয়ে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন, তাদের জেনে রাখা ভালো, প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় সহযোগিতায় গত আট বছর অর্থমন্ত্রী প্রমাণ করেছেন যে, তাদের দিকনির্দেশনা ও বাজেটগুলো দেশের জন্য মঙ্গলকর। ফলে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের এ অবিশ্বাস্য সাফল্যের জন্য বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্টগুলো অর্জন করেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য দারিদ্র্যসীমা অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা। এছাড়া মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালে যা ৫৭০ মার্কিন ডলার ছিল, বর্তমানে তা এক হাজার ৬০২ ডলার, বার্ষিক জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ অতিক্রম করেছে, সব সরকারি কর্মচারীর বেতন শতভাগ বৃদ্ধি করেও মূল্যস্ফীতি ও বেকারের সংখ্যা ৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে পেরেছে। এগুলো সত্যি অবাক করার মতো বিষয়। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, বিশ্বে যেসব দেশে প্রবৃদ্ধি ত্বরিত গতিতে বাড়ে, সেসব দেশে আয়ের বৈষম্য অত্যধিক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বাড়ার পাশাপাশি আয়-বৈষম্য ততটা বাড়েনি। বাংলাদেশে আয়-বৈষম্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো যেমন: ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকেও অনেক কম এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এর সবই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও সরকারের সুচিন্তিত, বাস্তবভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি ও বাজেটের রোডম্যাপের কারণে। যেখানে বাংলাদেশকে ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের মতো খ্যাতনামা পত্রিকা ‘ঝঃধহফধৎফ ইবধৎবৎ ড়ভ ঃযব ঝড়ঁঃয’ (দক্ষিণ এশিয়ার আদর্শ) আখ্যায়িত করেছে। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাজ্যের নামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’ বলেছে, বিশ্বে মাত্র তিনটি দেশের অর্থনীতি খুব ভালো করছে। এগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ। এ বিষয়টা কি সংসদ সদস্যরা ভুলে গেছেন যে অর্থমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে হলো?

প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী যে দেশেই সফরে যাচ্ছেন, সেসব দেশের রাষ্ট্রনায়করা প্রায়ই বাংলাদেশের এ অভাবনীয় সাফল্য কিভাবে সম্ভব হলো, তা জিজ্ঞেস করেন। তবে দুঃখের বিষয়, যারা অর্থমন্ত্রীর বার্ধক্য ও প্রজ্ঞার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাদের কাছে প্রশ্ন: তারা কি বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্যকে সাফল্য মনে করেন না? যার জন্য তারা দাবি তুলেছেন ‘অর্থমন্ত্রী বিদায় হন, আপনার বাজেট আর দেখতে চাই না।’

মোদ্দাকথা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটটি স্বপ্নপূরণের বাজেট। এর দিকনির্দেশনা বা রোডম্যাপ প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, স্থিতিশালী, আত্মনির্ভর অর্থনীতি বিনির্মাণের বাজেট। (শেষ)

 

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে

বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি