প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

স্বপ্নপূরণের বাজেট

বাজেট নিয়ে এবার অনেক বিতর্ক হলো, যা দেশের জন্য ভালো। তবে বিতর্ক যদি ব্যক্তিবিশেষের ওপর বিষোদগার না হয়ে বস্তুনিষ্ঠ হতো, তাহলে আরও ভালো হতো। তবে সুখের বিষয়, এসব আলোচনা-সমালোচনায় জনগণের মঙ্গল হয়েছে, বাজেটটি জনবান্ধব হয়েছে। বাজেট যে শুধু কয়েকটি অঙ্কের সমাহার নয়Ñএর জীবন আছে, এর প্রয়োজনে মানুষের যেমন উপকার হবে, একইভাবে অতিরিক্ত করের বোঝায় মানুষের জীবন অভিশপ্ত হতে পারে, এ সত্যটি আবার প্রমাণ হলো।

নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত ভ্যাট বাধ্যতামূলক করলে ভোটের খেলায় পরাজয় হতে পারেÑসরকারের পুনর্নির্বাচনে জয় বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এ উপলব্ধি নিশ্চয় উত্তম। শুধু ভ্যাটের ক্ষেত্রে নয়, গুটিকয়েক পুলিশের অতিমাত্রায় খবরদারি ও অত্যাচার বা সরকারি কর্মচারী অথবা কোনো কোনো দলীয় নেতৃত্বের দুর্নীতি বা অবিচার যে ভোটের খেলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তার উপলব্ধি অতীব প্রয়োজন এবং সেই মতে কাজ করা প্রয়োজন।

বস্তুত গুটিকয়েক দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের জন্য বা অতিউৎসাহী কর্মচারী বা দলীয় নেতৃত্বের জন্য সময় সময় সরকারের বহুবিধ উন্নয়ন এবং জনবান্ধব সেবা ম্লান হয়ে যায়। যেমন বেসিক বা সোনালী ব্যাংকের কেলেঙ্কারি বা হরিলুট এবং অসৎ লোকদের যথোপযুক্ত শাস্তি না দেওয়ায় বা আড়াল করায় সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা একবাক্যে সরকারের ওপর বিষোদগার করেছেন এবং অর্থমন্ত্রীকে ‘ঝপধঢ়বমড়ধঃ’ বা বলির পাঁঠা বানিয়েছেন। তবে এসব ব্যাংকে কেলেঙ্কারির নায়করা কিন্তু আড়ালেই থেকে গেলেন। সমালোচকরা বলেছেন, ‘চোরের গলা বড় গলা’ এবং এদের মধ্যেই অনেক রাঘব বোয়াল রয়েছেন, যারা সরকারের সুযোগ-সুবিধা অন্যায়ভাবে নিয়েছেন এবং তারা সরকার থেকেও ক্ষমতাবান। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থমন্ত্রী কোনো কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদনও জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেননি।

কোনো একজন সংসদ সদস্য ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে সরকারের পুনঃঅর্থায়নকে ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে অর্থমন্ত্রীকে জেলে পাঠাতে সুপারিশ করেছেন। ব্যাংকগুলোকে সচল না রাখলে যে বহু মানুষের চাকরি যাবে, অর্থনীতির সমূহ ক্ষতি হবে, এক এক করে কয়েকটি ব্যাংক যদি দেউলিয়া হয়ে যায় বা লাল বাতি জ্বালায়, তাহলে তার ফলে বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর এর যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা হয়তো তিনি ভেবে দেখেননি। তিনি হয়তো জানেন না, ২০০৮ সালে যখন মার্কিন অর্থনীতিতে ধস নামে তখন অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হয় বা লাল বাতি জ্বালায়। যখন আরও অনেক বড় ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিল তখন এগুলোকে জিইয়ে রাখার জন্য প্রথমে বুশ প্রশাসন এবং পরবর্তী সময়ে ওবামা প্রশাসন দু-দুবারে সর্বমোট ৬ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়ে মার্কিন ব্যাংকগুলো ও অর্থনীতিকে চাঙা রাখে এবং এর ফলে গোটা বিশ্ব অর্থনীতি আবার চাঙা হয়ে ওঠে। এ ভর্তুকিকে তারা ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। আমাদের দেশেও পোশাকশিল্পকে চাঙা রাখার জন্য ‘স্টিমুলাস’ বা ‘প্রণোদনা’ দেওয়া হয়। যা হোক, এসব বিতর্কে না গিয়ে যে জিনিসটি লক্ষণীয় তা হচ্ছে, সরকারদলীয় মন্ত্রীরাও যারা প্রস্তাবিত বাজেটটি মন্ত্রিসভায় পাস করেছেন, তারাও এ নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য রাখেন। প্রস্তাবিত বাজেটটি অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন এবং উপস্থাপন করার আগে তা মন্ত্রিসভায় চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মন্ত্রিসভার সব সদস্যের সম্মতিতে তা গৃহীত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব মন্ত্রী তাদের সুপারিশগুলো কি তুলে ধরেছিলেন এবং তুলে ধরার পর যখন তা গৃহীত হলো না, তখন তারা কেন তা মেনে নিলেন? মোট কথা, মন্ত্রিসভা ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে প্রস্তাবিত বাজেট গৃহীত হয় এবং প্রস্তাবিত বাজেটটি যেহেতু ‘যৌথ বা জয়েন্ট দায়দায়িত্ব’, তাহলে একজনের ওপর এত গলাবাজি কেন? ভ্যাটের বিষয়টি ২০১২ সালে এ সরকার গ্রহণ করে এবং গেল বছর তা বাস্তবায়ন না করে এ বছরে করবে বলে প্রস্তাব দেয়। প্রাক্-বাজেট আলোচনায় নতুন ভ্যাট আইন এ বছরে চালু না করার জন্য সুপারিশ এসেছে, তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিসভা তা আমলে নেয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটের তিনটি ইস্যু সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এগুলো হচ্ছেÑ১. নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের প্রস্তাব, ২. ব্যাংকে সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপ ও ৩. লোকসানি ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত টাকা বরাদ্দকরণ এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদ মার্কেটভিত্তিক করার সুপারিশ।

উল্লেখ্য, গৃহীত বাজেটে ১ ও ২ নং বাতিল হয়েছে এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদ এখনও আগের মতো অধিক রয়ে গেছে। নি¤œ ও মধ্যম আয়ের জনগণের যাতে অসুবিধা না হয়, সেজন্য এক্ষেত্রে পুরোনো সুদ রাখা হয়েছে। তাই এদের অনেকেই সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর নির্ভরশীল।

তবে তারা এক্ষেত্রে আবগারি শুল্কের মতো ব্যবস্থা নিতে পারতেন। ইনস্টিটিউশন বা করপোরেট সঞ্চয়পত্রের ওপর আলাদা সুদ নির্ণয় করা হয়তো অযৌক্তিক নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এ কয়েকটি দুর্বলতা ছাড়া বাজেটটি অত্যন্ত উন্নতমানের। বস্তুত বলা চলে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ বাস্তবায়নে এবং দেশরতœ শেখ হাসিনার ‘ভিশন ২০২১’ ও ‘ভিশন ২০৪১’ অর্জনে এ হচ্ছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার ও রোডম্যাপ। তাই অর্থমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন, এ বাজেট হচ্ছে তার ‘শ্রেষ্ঠ বাজেট’। যদি প্রধানমন্ত্রীর ‘রূপকল্প’ বা ‘ভিশনগুলো’ অর্জন করতে হয়, তাহলে এ বাজেটের বিকল্প সীমিত।

২০১৭-১৮ সালের বাজেট গেল কয়েকটি বাজেটের ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতি ও অর্জন। এর প্রধান লক্ষ্য উন্নয়নের মহাসড়কে আমরা যে পথচলা শুরু করেছি, তা চরিতার্থ ও অর্জন করা। এজন্য এ বাজেটে উন্নয়ন খাতে অধিক বরাদ্দ ধরা হয়েছে। ২০১৬-১৭ সালে উন্নয়ন খাতে (এডিপি) বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৩৫ শতাংশ। বর্তমান বাজেটে তা ৪১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এটি ছোটখাটো ব্যাপার নয়। মোট বাজেট চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন বাজেটে সর্বমোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৪ হাজার ৫৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪১ শতাংশ।

দুঃখের বিষয়, উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন দিন দিন অধিকতর খারাপ হচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন ছিল প্রায় ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১০-১১ অর্থবছরে তা বর্ধিত হয়ে দাঁড়ায় ৯৭ দশমিক ১ শতাংশে। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোয় বাস্তবায়ন হার খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এডিপির বাস্তবায়ন দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেজন্য বাজেট বাস্তবায়নের ওপর সমধিক জোর দিতে হবে। সেই সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে বেহুদা বা স্পুরিয়াস কাজে অপচয় না হয়, তার জন্য তদারকি বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ, সিলেট ও সুনামগঞ্জ এলাকায় যেসব বাঁধ দেওয়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তার ৯০ শতাংশই নাকি অপচয় হয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্বল বাঁধগুলো ভেঙে যখন ‘কালো পানি’ ওই এলাকায় প্রধান ফসল, হাজার হাজার কোটি টাকার শস্য, মাছ, পাখি ধ্বংস করে নিয়ে যায় তখন ‘হাওর উন্নয়ন বোর্ডের’ নয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মচারী যুক্তরাষ্ট্রে ‘নায়াগ্রা’ প্রপাত ভ্রমণে হাওয়া খাচ্ছিলেন। এমন সংবাদ সরকারের ভাবমূর্তিকে দুর্বল করে এবং বিদেশ সফরের যে অপ্রতিরোধ্য হিড়িক শুরু হয়েছে, তার ফলে সরকারের সম্পদের বা জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকারই অপচয় হচ্ছে; সে সম্পর্কে সজাগ হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান সরকার মানুষের প্রত্যাশাকে অনেক ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে এবং এর ফলে মানুষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সেসব চাহিদা মেটানোর জন্য সম্পদের অপ্রতুলতা রয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের বাজেট দেশের বার্ষিক আয় বা জিডিপির মাত্র ১৪ শতাংশ, যা নিতান্ত অল্প। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা অন্য সব উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশে এর গড় হার প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে সুখের কথা, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমাদের দেশে এর হার ছিল মাত্র ১২ দশমিক শতাংশ এবং বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টার ফলে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশে। আর বর্তমান বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে জিডিপির ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা চার লাখ কোটি টাকার ওপরে। তবে দেশের চাহিদা বিবেচনায় এবং বহুবিধ লক্ষ্য অর্জনের জন্য এ বাজেট ৭ লাখ কোটি টাকা হলেও আকাশকুসুম কিছু হতো না। দেশের মোট জিডিপির যদি ৩০ শতাংশ বাজেট পাস করা যেত, তাহলে তা প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ কোটিতে পৌঁছাত। আমরা যদি ৮ থকে ১০ শতাংশ বা দুই অঙ্কের বার্ষিক জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই তাহলে বাজেট আরও বাড়াতে হবে, এর বিকল্প নেই। তাই বাজেটটি বাস্তবায়নযোগ্য, কাল্পনিক নয়। তবে তার জন্য প্রশাসনিক দক্ষতা যেমন বাড়ানো দরকার, সেই সঙ্গে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।

বাজেটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ‘স্বপ্নপূরণের’ রোডম্যাপ হিসেবে যেসব খাতে অধিকতর বিনিয়োগ দরকার, সে খাতগুলোয় যথার্থভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেমন অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার বাবদ, জ্বালানি, রাস্তাঘাট, হাইওয়ে প্রভৃতি বাবদ প্রায় ৪৮ শতাংশ বর্ধিত করা হয়েছে। গেল অর্থবছরে এ বাবদে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, যা বর্তমান বাজেটে বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ১০ কোটি টাকা। তবে সরকারকে এসব বাবদ বাজেট যাতে সঠিকভাবে ব্যবহƒত হয়, তার জন্য কঠোর হতে হবে। নতুবা দুর্নীতির ও স্বজনপ্রীতির কারণে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ভেস্তে যাবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ হচ্ছে এর জনগণ এবং নদীনালা জলাশয়। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য যেমন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য খাত প্রভৃতিতে বাজেট রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। যদি বরাদ্দকৃত এ অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুণগত মান ও প্রশিক্ষণ না বাড়াতে পারে তাহলে এর প্রতিফলন উন্নয়নের মহাসড়কে বিড়ম্বনা নিয়ে আসতে পারে। উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ জনবলের অভাব হেতু আমরা ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে’ হোঁচট খেয়েছি। উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের অভাব হেতু বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের চাকরি দিতে হচ্ছে এবং এর ফলে প্রতিবছর প্রায় চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। তবে এ কথাও তলিয়ে দেখতে হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত বাজেট যেন গুণগত মান ও উন্নত প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যবহƒত হয়, অপচয় না হয়।

(আগামীকাল সমাপ্য)

 

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে

বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি