Print Date & Time : 21 October 2020 Wednesday 8:13 am

স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা

প্রকাশ: March 26, 2020 সময়- 12:44 am

কাজী সালমা সুলতানা: ২৬ মার্চ, ১৯৭১। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র নিরপরাধ বাঙালির বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করলে মুক্তি সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানায় ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকজনদের হত্যা করছে। ঢাকা-চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ, দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। কোনো আপস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এই সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।’

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে মেশিনগান, মর্টারসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে বাঙালি নিশ্চিহ্নে নেমে পড়ে। আগুনের লেলিহান শিখায় বাংলাকে ছারখার করতে শুরু হরে। অন্যদিকে এ রাতেই জš§ নেয় বাঙালির জাতিরাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি যে, যে যেখানে আছ, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ  করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’

রাত প্রায় ১টার সময়ে কর্নেল জেড এ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা দল ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে পৌঁছে। গেটে পৌঁছেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা গুলি চালাতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক স্থানীয় পুলিশ কর্মী সেই গুলিতে মারা যান। দোতলায় বঙ্গবন্ধু স্ত্রী ও সন্তানদের একটা ঘরে বন্ধ করে বাইরে থেকে আটকিয়ে দেন এবং যতটা উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেন ‘ফায়ারিং বন্ধ করো’। বঙ্গবন্ধু ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কর্নেল জেড এ খান বঙ্গবন্ধুকে আদেশ করেন তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে আসেন। এরপর ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর ওয়ারলেস মেসেজ পাঠান ‘বিগ বার্ড ইন কেজ, স্মল বার্ডস হ্যাভ ফ্লোন’। ওই রাতে বঙ্গবন্ধুসহ সবাইকে আদমজী স্কুলে রাখা হয়। সকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গ্রেপ্তার করা সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন বঙ্গবন্ধুকে ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়।

নবসূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় নতুন প্রতিজ্ঞার ইতিহাস। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলার অবরুদ্ধ রাজধানী ঢাকা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা দিনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে সশস্ত্র যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে দেশের সর্বত্র চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হ্যান্ডবিল আকারে ইংরেজি ও বাংলায় ছাপিয়ে চট্টগ্রামে বিলি করা হয়। আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামের ইপিআর সদর দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়ারলেস মারফত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. হান্নান বেলা ২টা ১০ মিনিট এবং ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

পাক-হানাদার বাহিনী ঢাকায় দিন-রাত কারফিউ দিয়ে দলে দলে রাস্তায় নেমে ভবন, বস্তি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসভবনের ওপর ভারী মেশিনগান ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। বিদেশি সাংবাদিকদের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আটক রাখা হয়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দি পিপল, সংবাদ, ইত্তেফাক, বাংলার বাণী অফিস এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ট্যাংকের গোলায় ধ্বংস করে দেয়।

সকালে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো কড়া সামরিক প্রহরায় ঢাকা ত্যাগ করেন। বিমানে ওঠার আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, ‘ধন্যবাদ, পাকিস্তান বেঁচে গেল।’ করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি ঢাকায় সেনাবাহিনীর অপারেশনের প্রশংসা করে বলেন, আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ। সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে।

রাত ৮টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান করাচি থেকে এক বেতার ভাষণে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলন করে রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করেছেন। ইয়াহিয়া বলেন, ‘আমি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নিতে পারতাম। কিন্তু আমি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষপাতী বলেই ন্যায়সঙ্গত উপায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান চেয়েছি। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের একগুঁয়েমি, অনড় মনোভাব থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়, লোকটি এবং তার দল পাকিস্তানের শত্রু। শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সংহতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হেনেছেন। এ অপরাধের জন্য তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বিবিসি সংবাদ