প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে

কাজী সালমা সুলতানা: ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। এদিন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়। এছাড়া কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কামুদপুরে পাক সেনাদের সঙ্গে এক সম্মুখ যুদ্ধে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চার সদস্য শহিদ হন।

ভারত বাংলাদেশের যৌথ লড়াইয়ের তৃতীয় দিন আজ। বাংলাদেশে পাক বাহিনীর প্রায় সব জঙ্গি বিমান বিধ্বস্ত হয়। শত্রুমুক্ত হয় স্বাধীন বাংলার আকাশ।

দিনভর ভারতীয় জঙ্গিবিমানগুলো অবাধে আকাশে উড়ে, পাক সামরিক ঘাঁটিগুলোয় প্রচন্ড আক্রমণ চালায় এবং অকেজো করে দেয় বিমানবন্দরগুলো। ভারতীয় বিমানবাহিনীর হিসাব মতে, ১২ ঘণ্টায় ২৩১ বার তেজগাঁও ও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে ৫০ টনের মতো বোমা ফেলা হয়। পাক বাহিনীর কনভয়ের ওপর ভারতীয় জঙ্গিবিমানগুলো আক্রমণ চালায়। এতে পাক বাহিনীর ৯০টি গাড়ি ধ্বংস হয়। এছাড়া পাক বাহিনীর সৈন্যবোঝাই কয়েকটি লঞ্চ ও স্টিমারও ধ্বংস হয়।

এই দিন মুক্তিবাহিনী ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে সব দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ঘাঁটি দখল করে নেয়। সম্মিলিত মিত্র বাহিনীর ১৫টি ফ্রন্টে তাদের অগ্রগতি অব্যাহত রাখে। যশোর সেক্টরে কোটচাঁদপুর দখল করে তারা ঝিনাইদহের দিকে অগ্রসর হয়। পতিমধ্যে মুক্তিবাহিনী খালিশপুর সেতু দখল করে এবং কুষ্টিয়ার কাজীপুরের পতন ঘটায়।  মিত্রবাহিনী তিতাস ব্রিজ দখল করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার দিকে এগিয়ে চলে। তারা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সঙ্গে কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে।  

সাবমেরিন ‘গাজী’ পাক নৌবহরের গর্বের বস্তু। বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ডের সফল আক্রমণে তা ধ্বংস হয়। সাবমেরিনটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান ধার হিসেবে পেয়েছিল। নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ড চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সব নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জাহাজকে বন্দর ত্যাগের পরামর্শ দেয়। তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতেও অপারগতা প্রকাশ করে। এতে বিশ্বের সব দেশ বুঝতে পারে, বাংলাদেশের বন্দরগুলো রক্ষা করার ক্ষমতা আর পাক বাহিনীর নেই। মিত্রবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট স্থলপথে এগিয়ে আসতে থাকে। প্রধান সড়ক দিয়ে না এগিয়েও মিত্রবাহিনী বিভিন্ন সেক্টরের প্রধান প্রধান সড়কের কতগুলো এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের; নাটোরের সঙ্গে ঢাকা ও রংপুরের এবং যশোরের সঙ্গে নাটোর ও রাজশাহীর যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এদিন ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়ার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী আখাউড়ার দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশ দিয়ে অবরোধ করে। এখানে পাক বাহিনী মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে অবশেষে আত্মসমর্পণ করে। ফলে আখাউড়া সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। এ যুদ্ধে সুবেদার আশরাফ আলী খান, সিপাহি আমির হোসেন, লেফট্যানেন্ট বদিউজ্জামান, সিপাহি রুহুল আমিন, সিপাহি সাহাবউদ্দিন ও সিপাহি মুস্তাফিজুর রহমান শহিদ হন। আখাউড়া মুক্ত হওয়ার পর কিছু পাক সেনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পালিয়ে যায় এবং ১৬০ জন মিত্রবাহিনীর হাতে নিহত হন।

এদিন নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় যে অধিবেশন বসে, তাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এক প্রস্তাব উত্থাপন করে। এ প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক রাজনৈতিক নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন, যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান নিশ্চিতভাবেই ঘটবে। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পাকিস্তানি বাহিনীর যে সহিংসতার দরুন পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, তাও অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এ প্রস্তাব একমাত্র পোল্যান্ড সমর্থন করে। চীন বাদে পরিষদের অন্য সব সদস্য ভেটো দানে বিরত থাকে। চীন ভোট দেয় বিপক্ষে। ওই দিন আরও আট দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে আরও একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। প্রস্তাবের মর্ম যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের অনুরূপ হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন তার দ্বিতীয় ভেটো প্রয়োগ করে। এ সময় ‘তাস’ মারফত এক বিবৃতিতে সোভিয়েত সরকার উপমহাদেশের যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানকে সর্বাংশে দায়ী করে পূর্ববাংলার জনগণের আইনসংগত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানায়।

সোভিয়েত সরকার মনে করে, এ সংঘর্ষ সোভিয়েত সীমান্তের সন্নিকটে সংঘটিত হওয়ায় এর সঙ্গে সোভিয়েত নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত এবং পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে বিবদমান দুই পক্ষের যে কোনোটির সঙ্গে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকতে বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। উপমহাদেশের সংঘর্ষে পাকিস্তানের সহায়তায় তার দুই মিত্র কী ব্যবস্থা নিতে পারে, স্পষ্টতই তার সঠিক উপলব্ধির ভিত্তিতে ওই সোভিয়েত বিবৃতি প্রচারিত হয়। ‘দি ক্যানবেরা টাইমস’ পত্রিকায় অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রকাশিত  বিবৃতিতে  ভারত পাকিস্তান সংঘর্ষে  অস্ট্রেলিয়ার নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা ঘোষণা করা হয়।

চারদিকে বিজয়ের সংবাদে রণাঙ্গনে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের আরও উৎসাহ দেয়ার জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের রণসংগীত অনবরত বাজতে থাকেÑ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম/ মোরা ঝরনার মতো চঞ্চল,/ মোরা বিধাতার মতো নির্ভয়/মোরা প্রকৃতির মতো সচ্ছল।’

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, মূলধারা ৭১ ও ৭১-এর দশ মাস