প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

স্বাস্থ্যব্যয় ও জীবনযাপনে বৈষম্য আরও বাড়ছে

শেখ আবু তালেব: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে সরকার। কয়েকটি সূচকে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির কথা উঠে এসেছে। অপরদিকে উন্নয়নের সুবিধা সমহারে বণ্টিত না হওয়ায় সব খাতেই বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যক্তি নিরাপত্তা, গুণগত শিক্ষা এবং ব্যক্তি ও সামষ্টিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবৃদ্ধির সুফলের ছাপ দেখা যায়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ। ‘জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন, ২০২১’-এ উঠে এসেছে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের বিভিন্ন খাতের পরিবর্তনের তথ্য। ‘অ্যাডভান্সিং ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ, লুকিং অ্যাহেড’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অর্থনীতির আকার, মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, শিক্ষার হার, বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা, মাতৃমৃত্যুর হার, নবজাতকের মৃত্যুহার, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও জাতীয় আয়ে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি খাতের মধ্যে বৈষম্যর হার কমিয়ে আনা ও কর্মসংস্থানে আশানুরূপ অর্জন নেই। এটিতে হতাশ বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, আগামীতে বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন সূচক নির্ভর করবে কয়েকটি খাতে সরকার কেমন পরিকল্পনা নেয় তার ওপর। জাতিসংঘের ইউএনসিএইচআর কর্তৃক চিহ্নিত বিষয়গুলো হচ্ছে, ব্যক্তি ও সামষ্টিকভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানসম্মত জীবন-যাপন, অংশগ্রহণমূলক তৎপরতা, ব্যক্তি নিরাপত্তা ও সমতা। এসব বিষয়গুলোই ঠিক করবে আগামীতে মানব উন্নয়ন সূচকগুলো কেমন হবে।

জাতিসংঘের মতে, প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। আবার একটি আরেকটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত। তাদের এই সংযুক্তিই মানব উন্নয়নের সূচকগুলোতে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে।

বাংলাদেশে গত তিন দশকে বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি উঠেছে গুরুত্বসহকারে। প্রতিবেদনটিতে দারিদ্র্য ইস্যুতে গত তিন দশকের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশের ওপরে। অতি-দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশের ওপরে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ২০ ও ১০ শতাংশের ওপরে। কিন্তু করোনা মহামহারিতে দেশে দারিদ্র্যের হার ও সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এ-সংক্রান্ত ২০২০ ও ২০২১ সালের কোনো তথ্য দেয়া হয়নি প্রতিবেদনটিতে।

তথ্য না থাকায় গত দুই বছরের দেশের দারিদ্র্যের হার নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো পরিসংখ্যান এখনও তৈরি হয়নি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতার আলোকে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধিতে ধারণা দিতে কিছু জরিপ চালিয়েছে। এর মধ্যে গবেষণা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) জরিপের তথ্যমতে, ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশামিক ৩০ শতাংশ। ২০১৮ সালে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু ২০২০ সালের শেষে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে।’

এ হিসাবে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার বিবেচনায় বাংলাদেশ ২০০৫ সালের অবস্থানে ফিরে গিয়েছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি হয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশের ওপরে ও অতি-দারিদ্র্যের হার ছিল ২৫ শতাংশের ঘরে।

বাংলাদেশের অতি দারিদ্র্য ও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবসাকারীদের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে নাক পর্যন্ত ডুবে থাকা ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেছেন, তারা কোনোমতে নাক উঁচিয়ে জীবন-যাপন করছে। কখনও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে অর্থাৎ পানি নাকের ওপরে চলে যাচ্ছে। আবার চেষ্টার মাধ্যমে পানির ওপরে নাক ভাসিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে বেঁচে থাকতে। এভাবে কখনও দারিদ্র্যের মধ্যে আবার কখনও দারিদ্র্যসীমার ওপরে বসবাস করছে তারা। আসলে তারা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনের সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, জীবন-যাপনের ব্যয়, ভোগ, শিক্ষা ও আয়ে বৈষম্য তীব্র হয়েছে। অর্থাৎ দরিদ্র, অতি-দরিদ্র ও নিন্মবিত্তরা এসব নাগরিক সুবিধা পেতে হিমশিম খাচ্ছে। অপরদিকে এসব সুবিধার পুরোটাই ভোগ করছে ধনী শ্রেণির মানুষ। এভাবে প্রতিনিয়ত ধনি ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। ধনী আরও সম্পদশালী হচ্ছে, অপরদিকে গরিব আরও আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে বৈষম্যর পার্থক্যটা আগের চেয়ে আরও বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১০ সালে জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল দশমিক ছয় শতাংশের ঘরে। ২০১৫ সালে তা দশমিক ৬৫ শতাংশ, ২০১৮ সালে তা দশমিক ৬৭ শতাংশ ও সর্বশেষ ২০১৯ সালে তা দশমিক সাত শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালের তথ্য এখানেও দেয়া হয়নি।

এ সময় শিক্ষায় ২০১০ সালে বৈষম্যর হার ছিল দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৩৫ শতাংশ। আবার ২০১০ সালে আয়ের দিক দিয়ে বৈষম্যর হার ছিল দশমিক চার শতাংশ। কিন্তু ২০১৯ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে দশমিক পাঁচ শতাংশে। এভাবে সার্বিকভাবে ২০১০ সালে বৈষম্যের হার ছিল দশমিক ৭৭ শতাংশ। কিন্তু ২০১৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আমাদের দেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্যর পার্থক্যের বিষয়টি ধীর ধীরে বড়ই হচ্ছে। এতে মানব উন্নয়নের দিক দিয়ে যতটুকু এগিয়ে যাচ্ছি, তাতে সার্বিক বিবেচনায় ক্ষতি হচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও প্রতিবেদন প্রণয়ন উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুবিধা সবার কাছে সমহারে পৌঁছানো যায়নি। উন্নয়ন পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। উন্নয়নের আওতায় সামাজিকভাবে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এতে বৈষম্য প্রকট হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়লেও সেবাপ্রাপ্তির জায়গায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দরিদ্র বেড়েছে। শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হয়নি।’

স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্যের বিষয়ে বলা হয়, এখনও ৪১ শতাংশ সন্তানের জন্ম হয় অদক্ষ দাই ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। মাত্র ৫৯ শতাংশ সন্তানের জন্ম হয় দক্ষ ধাত্রী ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে। আবার অতিদরিদ্রের মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশ নারী দক্ষ ধাত্রীর সেবা পাচ্ছেন, মধ্যবিত্তের যে হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ শতাংশ। আবার ধনীদের শতকরা ৮৬ শতাংশই এসব সুবিধার পুরোটুকু পাচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি পুরো দেশের সার্বিক চিত্র। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি আরও করুণ। এতে বোঝা যায়, সরকারিভাবে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা এখনও নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি। ২৫ শতাংশ গর্ভবতী নারী প্রসবজনিত কোনো প্রকার স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত রয়েছে। ভূমিষ্ঠ সন্তানের মধ্যে ২২ দশমিক ছয় শতাংশই জন্ম নিচ্ছে কম ওজন নিয়ে।

সার্বিক মূল্যায়ন নিয়ে অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু সূচকে ভালো করেছিÑবিশেষ করে গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, শিক্ষার হার ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে। এসবের মধ্যেও আমাদের সামনে এখন বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন এলডিসি থেকে উত্তরণের পর্যায়ে রয়েছি। সরকারের ভিশন ২০৪১ রয়েছে। দ্বৈত উত্তরণ ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ বাস্তবায়নের সময় পার করছি। এই সময়ে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে।’ বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থানের দিকে জোর দিতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণে পরামর্শ দিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের জাতীয় নীতিতে কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। সরকারি সেবার মান বৃদ্ধিতে মনোযোগী হতে হবে। আর সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার ও মন্দ কাজের জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থা পুনরোজ্জীবিত করলে সুশাসনে অগ্রগতি হবে।

এজন্য আগামীর উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রতিবেদনটিতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে, জাতীয়ভাবে মানব উন্নয়নে কৌশলগত পরিবর্তন আনতে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, মানব উন্নয়ন ইস্যুতে গত পাঁচ দশকে জাতীয়ভাবে একাধিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস)।

জাতীয় নীতিমালা কর্মকৌশলের পাশাপাশি গত পাঁচ দশকের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ভূমিকা রেখেছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) এসব উন্নয়নে অবদান রেখেছে। বিশেষ করে যেসব জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক পর্যায়ে সহজে কোনো সেবা পৌঁছানো যায় না, সেখানে এনজিও ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে শিক্ষা, কৃষি, হাঁস-মুরগি ও গরুর খামারের কার্যক্রমে গতি এসেছে।