মত-বিশ্লেষণ

স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন: প্রেক্ষিত মা ও শিশু স্বাস্থ্য

মো. হাবিবুর রহমান: শাহানাজ খাতুনের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায়। ডিগ্রি পড়া অবস্থায় তার বিয়ে হয়। বিয়ের দু’বছর পর গর্ভবতী হন তিনি। গর্ভধারণের দু’মাসের মাথায় স্বামীর সঙ্গে পাশের গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিকে যান। ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী সবকিছু পরীক্ষা করে খাবার ও বিশ্রামের তালিকা তৈরি করে দেন এবং পরবর্তী ক্লিনিকে আসার তারিখ জানিয়ে দেন। শাহানাজ সবগুলো টিকা গ্রহণ করেছেন। শারীরিক জটিলতাও তার নেই। এখন শুধু অনাগত শিশুর জন্য অপেক্ষা।

স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ মতো শাহানাজ চলছেন। নির্দিষ্ট সময়ে প্রসববেদনা উঠলে তাকে কমিউনিটি ক্লিনিকে আনা হয়। স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তায় শাহানাজ স্বাভাবিকভাবে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন। শাহানাজের কমিউনিটি ক্লিনিক সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ছিল। স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করায় প্রথমবারের মতো মা হতে কোনো জটিলতা হয়নি। এখন গ্রামের নারীরা সবাই যে কোনো সমস্যায় কমিউনিটি ক্লিনিকে আসেন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ নেন।

আমাদের দেশে এক সময় মাতৃমৃত্যু একটা বড় সমস্যা ছিল। তবে সরকার গৃহীত পদক্ষেপের ফলে গত এক দশকে মাতৃমৃত্যু হার অনেক কমেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন নারীর গর্ভাবস্থা কিংবা প্রসবোত্তর ৪২ দিনের মধ্যে শারীরিক জটিলতার কারণে মৃত্যু ঘটলে, তাকে মাতৃমৃত্যু হিসেবে ধরা হয়।

নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও গত এক দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষ করে মা ও শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এ অগ্রগতি এখন দেশের বহির্বিশ্বেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে মা ও শিশুমৃত্যুর হার। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যু হার প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১ দশমিক ৭৩, যা ১৯৯০ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে প্রায় ৬ শতাংশ ছিল। এই মাতৃমৃত্যু হার কমে আসার পেছনে অনেকগুলো ধাপ আছে। প্রথমেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা কমপক্ষে চারবার নিতে হবে। সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার কল্যাণ কেন্দ , মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ , উপজেলা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কেন্দে  এই সেবা বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রসূতিসেবার লক্ষ্যে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যা ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহায়তায় সরকার পরিচালনা করে থাকে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সব সময় ২৪ ঘণ্টা চালু থাকছে। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের কী কী করণীয় এবং তাদের পুষ্টি পরামর্শ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেয়া হচ্ছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ গুলো থেকে। মা ও শিশুমৃত্যু রোধে ব্যাপক সাফল্য অর্জন এবং মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) সফলভাবে অর্জন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের পুরস্কার পেয়েছেন।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। যেখানে ১৯৯০ সালে একজন প্রজননক্ষম বিবাহিত নারী পাঁচটি শিশু জন্ম দিতেন, সেখানে ২০১৫ সালে তা ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি জন্ম নিয়ন্ত্রণের একটি বড় সাফল্য। স্বাস্থ্যকেন্দ গুলোতে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের পাঠক্রমেও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় এমন একটি সফল কর্মসূচির নাম হচ্ছে ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি)। এই কর্মসূচির আওতায় ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ছয়টি টিকা দেয়া হয় ০ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের। এ কর্মসূচিতে সহায়তা করছে অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন। এ কর্মসূচিতে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি, হাম, রুবেলা, পোলিও ও নিউমোনিয়ার মতো জটিল রোগগুলোর টিকা দেয়া হচ্ছে। এ কর্মসূচির বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয়ভাবে টিকা দানের হার শতভাবে উন্নীতকরণ। এছাড়া সরকার রোগ নির্মূল ও শিশুমৃত্যু রোধে নির্দিষ্ট সময় পরপর সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি করে থাকে। তাই বাংলাদেশে শতভাগ সফল কর্মসূচির নাম ইপিআই। এ সাফল্যের কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের মার্চে বাংলাদেশকে পোলিও নির্মূল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভ্যাকসিন হিরো’র অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। পাশাপাশি এ কর্মসূচির আওতায় ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম নারীদেরও টিটি টিকার পাঁচটি ডোজ দেয়া হচ্ছে।

আইসিডিডিআরবি’র তথ্য অনুযায়ী নব্বইয়ের দশকে অপুষ্টিতে ভোগা গর্ভবতী মা ও নারীর হার ছিল ৫০ শতাংশ। বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। দুই দশকে নারীর সার্বিক পুষ্টি-পরিস্থিতি ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে দেশে এখনও কম ওজন নিয়ে (লো বার্থ ওয়েট) শিশু গ্রহণ করছে। এ পেছনে রয়েছে মায়ের অপুষ্টি। প্রজনন বয়সে এখন এক তৃতীয়াংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। প্রতি তিনজন নারীর একজন আয়োডিন স্বল্পতার শিকার। মা আয়োডিনের স্বল্পতায় ভুগলে তার প্রভাব পড়ে শিশুর ওপর। আয়োডিন মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায়। ফলে মায়ের ঘাটতির কারণে শিশুর মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে না। এক্ষেত্রে দারিদ্র্যতাই নয়, অসচেতনতা অনেকাংশে দায়ী।

গর্ভাবস্থায় শিশু মায়ের কাছ থেকে পুষ্টি নেয়। এ সময় মায়ের পুষ্টি চাহিদা বাড়ে। মাকে যদি বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ানো হয় তাহলে মা ও শিশু দু’জনেরই পুষ্টির অভাব দেখা দেবে। এতে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি কম হবে, ওজন কম হবে। গর্ভাবস্থায় মাকে তাই স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি ফলমূল, শাকসবজি এবং পুষ্টিকর খাবার বেশি খেতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার পুষ্টির ওপর জোর দিচ্ছে। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি ২০১৭-২০২২’ বাস্তবয়িত হচ্ছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র স্বাস্থ্যবিষয়ক সূচকগুলো অর্জনেও বিরাট ভূমিকা রাখবে।

একজন সুস্থ মা’ই পারেন একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের সহায়তার জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে ৮ লাখ দরিদ্র নারীকে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিটি মা মাতৃত্বকালীন ভাতা হিসাবে প্রতি মাসে ৮০০ টাকা করে পাচ্ছেন। ২০ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সের একজন দরিদ্র মা প্রথম এবং দ্বিতীয় সন্তান গর্ভধারণকালে এই ভাতা পেয়ে থাকেন। মাতৃত্বকালীন ভাতা হলো দরিদ্র মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। এ ভাতা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৩ হাজার ৮১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ১০৭টি মেডিকেল কলেজ, ৫ হাজার ১৮২টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক, প্রায় ১০ হাজার ৪০০ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও অন্যান্য হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৫ লক্ষাধিক স্বাস্থ্যসেবা দানকারী দেশের সব প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে যা, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে একটি মজবুত ও টেকসই কাঠামোর ওপর দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছে। করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবা যাতে বিঘিœত না হয়, সে লক্ষ্যে সরকার জরুরিভিত্তিতে দুই হাজার ডাক্তার এবং ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে নারীদের স্বাস্থ্যকেন্দে  যাওয়া হার অনেক বেড়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে ঘরে বসেই স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে।

উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এখন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। সরকার নিয়মিত মনিটরিং করছে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে। গণমাধ্যমের নানারকম প্রচারের ফলে জনসচেতনতা তৈরি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন করা সবার দায়িত্ব। স্বাস্থ্য খাতে যে সফলতা এসেছে, তা আরও এগিয়ে নিতে আমাদের প্রত্যেকেরই সচেতনতা প্রয়োজন। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিধানসহ সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..