Print Date & Time : 3 June 2020 Wednesday 10:38 pm

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন মুখ ও দাঁতের যত্ন

প্রকাশ: মার্চ ২২, ২০২০ সময়- ০৯:৩৮ পিএম

প্রফেসর ডা. ইব্রাহিম খলিল:তানিশার বয়স চার বছর। বাবার একমাত্র আদরের সন্তান। চকোলেট তানিশার খুব পছন্দ। বাবা বিভিন্ন ব্যান্ডের দামি চকোলেট মেয়েকে কিনে দেন প্রায়ই। একদিন তানিশার দাঁতে খুব ব্যথা হলো। কিছুই খেতে পারছিল না। বাবা অফিস থেকে ফিরে মেয়েকে দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার পর ঠিকমতো দাঁত পরিষ্কার না করার কারণে দাঁতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, যাতে খাবার আটকে গিয়ে ইনফেকশন সৃষ্টি হয়েছে। ডাক্তার দাঁত পরিষ্কার করে কিছু ওষুধ এবং দাঁত সুস্থ রাখার জন্য পরামর্শ দিলেন।

উপরের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ দাঁত ও মুখের যতেœর ব্যাপারে অত্যন্ত অসচেতন। দন্ত বিশেষজ্ঞ হিসেবে দীর্ঘ ২৬ বছরে আমি রোগীদের অনেক ধরনের চিকিৎসা দিয়েছি এবং দিচ্ছি। কিন্তু প্রাথমিক অবহেলার খেসারত দিতে দিতে আমার রোগীরা কাহিল এবং আমিও তা দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তারা জানেন না যে, কত ছোট অজানা থেকেই অনেক বড় জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এসব শুধু দাঁত ও মুখের ব্যথাজনিত সমস্যাই সৃষ্টি করছে না বা শুধু মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রাই ব্যাহত করছে না, বরং বিরক্তিকর এই সমস্যাগুলো কর্মজীবন থেকে সাবলীলতা কেড়ে নিচ্ছে। মূল্যবান কর্মক্ষমতায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দাঁত তথা দীর্ঘ মেয়াদি মাড়ি রোগের ফলে সৃষ্ট ‘কেমিক্যাল মেডিয়েটর’Ñরক্তবাহিত হয়ে রক্তনালি, হƒদরোগ, কিডনি রোগসহ ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জটিলতা সৃষ্টি করে।

জাপান সরকার ১৯৮০ সাল থেকে আজ অবধি দাঁত ও মাড়ি রোগের ব্যাপারে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শসহ গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে, যা জনগণের গড় আয়ু ৭২ থেকে ৮৫-এর উপরে নিয়ে আসাতে ভূমিকা রেখেছে। এই রোল মডেল এখন বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়।

দাঁতের যতেœর বিষয়ে আমাদের দেশের মানুষের অসচেতনতা অত্যন্ত বেশি। অথচ মুখ ও দাঁতের পরিচর্যার ব্যাপারে আমাদের কিছু সাধারণ ভুল পরবর্তী সময়ে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করে। দাঁত ও মুখের যত্নের বিষয়ে আমাদের দেশের মানুষদের প্রচলিত এসব বদ্ধমূল এবং কুসংস্কাররাচ্ছন্ন ধারণা বদলানো প্রয়োজন।

ঠাণ্ডা-গরম বা মিষ্টি-টকের কারণে মাত্রাতিরিক্ত শিরশির নিয়ে যখন রোগীরা ডাক্তারদের কাছে আসেন, তখন পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই দাঁতের গোড়ার দিকে কাটা এবং ক্ষয় হয়ে যওয়া। এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্রাশ করার পদ্ধতিগত ভুলে এবং খাবারের পরপরই ব্রাশ করার জন্য হয়ে থাকে। তাই খাবারের পরপরই ব্রাশ করা ঠিক নয়। কারণ খাবারের সময় প্রাকৃতিক কারণে প্রাথমিক হজমের জন্য নিঃসৃত এসিডে দাঁতের আবরণ দ্রবীভূত থাকে। তাই খাবারের পরপরই ভালো করে কুলকুচি করা উচিত। তাই ব্রাশ করতে হবে খাবারের ১৫ মিনিট পরে। অন্যথায় দাঁতের টিসুর ক্ষয় হয়, যা অনেক জটিলতা পর্যন্ত গড়ায়। সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দাঁতের যতেœ বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।

অনেকেই মনে করেন, শিশুদের মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খেতে দিলে দাঁতের ক্ষতি হয়। বাড়ন্ত শিশুদের মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার একদম নিষেধ করা যাবে না। কারণ মিষ্টি খাবার না খেলে শরীরের দরকারি ও সহজাত ইনসুলিন নিঃসৃত হবে না। ফলে গ্রোথ হরমোন নিঃসরণও কমে যাবে, যা শিশুদের সাধারণ দৈহিক বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ক্যান্ডির মতো আঠালো খাবার, যা দাঁতে আটকে থাকে, তেমন খাবার বাদ দিতে হবে; যদিও নিয়ন্ত্রিতভাবে মাঝেমধ্যেই শিশুদের ভালোমানের চকোলেটসহ মিষ্টি খাবার খেতে দিতে হবে। এক্ষেত্রে খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুলকুচি করাতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে ব্রাশ করাতে হবে।

শিশুকে প্রতি রাতে সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ করার অভ্যাস করত হবে, আর তা হবে নরম ব্রাশ দিয়ে। দিনে তিন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বার পর্যন্ত ব্র্যাশ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি মেনে ব্রাশ করতে হবে। এছাড়া দাঁতে আটকে থাকা খাদ্যকণা পরিষ্কার করতে ফ্লসিং অত্যন্ত কার্যকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। এ বিষয়টির সঙ্গে আমাদের অভ্যস্ত হতে হবে।

অনেক সময় দাঁতের ক্ষয় রোগের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি মুখ গহ্বরে  এসিডের পরিমাণ বাড়িয়ে দাঁতের ক্ষতি করে। এজন্য পানি খাওয়ার সময় মুখে ৫-১০ সেকেন্ড পানি রেখে ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে পানি পান করলে দাঁতের ক্ষয় তথা পেটের এসিডিটি উপশম হয় এবং উপকার হয়। এক্ষেত্রে সুস্থ ও প্রাকৃতিক গুণাগুণ সমৃদ্ধ মুখের লালা পানির সঙ্গে মিশে বাফারিংয়ের মাধ্যমে দাঁতের আবরণের এসিডসহ পাকস্থলীর এসিড সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমাদের মূল্যবান দাঁত সুস্থ রাখে। গ্যাস্ট্রিক এসিডিটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

কালো বা বাদামি রং অতিরিক্ত দন্তক্ষয় নির্দেশ করে। দাঁতের এমন অবস্থা বা ক্যারিজ আছে এমন রোগীদের কম মিষ্টি, ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল যেমন লেবু, শসা, আমলকী, আমড়া, বিচি বাদ দেওয়া পেয়ারা ইত্যাদির যে কোনো একটি নিয়মিত খেতে হবে, যা শরীরে ভিটামিন-ডি ও ক্যালসিয়াম সংরক্ষণে বিশাল সহায়ক ভূমিকা রাখে এবং হাড়ের ক্ষয় রোধ করে।

অনেকে শিরশির করা দাঁতের জন্য ফ্লুরাইড যুক্ত পেস্ট ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু প্রতিদিন একই ধরনের পেস্ট ব্যবহারের ফলে দাঁতের ওপর হলুদ আবরণ পড়ে। পরে দাঁত ভঙ্গুর হয়ে যায়। এক্ষেত্রে নিয়ম করে অন্তত দুই ধরনের হার্বাল টুথপেস্ট ও ভালো মানের পেস্টসহ তিন-চারটি পেস্ট টিউব রেখে একেক দিন একেক পেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন। এতে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, যা সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

অনেকে হাড়, কাঁটা বা বিচি খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙে ফেলেন। আসলে মাংসের সঙ্গে হাড় বা কাঁটা আমাদের শরীরের হাড় বা দাঁত শক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা তো রাখেই না বরং দাঁতের ক্ষতিসহ শরীরে নানা রোগ এমনকি কোলন ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনেক অভিভাবক মনে করেন, বাচ্চাদের দাঁত না নড়লে দাঁত ফেলা যাবে না; এটা ভুল ধারণা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে শহুরে খাদ্যাভাসের কারণে ঠিকসময়ে দাঁত নড়ে না। এ সময় শুধু অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞই বলতে পারবেন বাচ্চাদের কোনো কোনো দাঁত কোনো সময় ফেলা উচিত হবে। না হলে আঁকাবাঁকা দাঁতসহ মুখের অসামঞ্জস্যতা দেখা দিতে পারে, যা পরে ঠোঁট মোটা হয়ে চেহারার বিকৃতি ঘটায়। এমন অবস্থায় নাককে বোঁচা করে চেহারা নষ্ট করে দিতে পারে।

স্ক্যালিং করলে দাঁতের ক্ষতি বা দাঁত ফেললে চোখের ক্ষতি হবেÑএমন ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আজকাল উন্নত চিকিৎসার ফলে দাঁত বলতে গেলে ফেলতেই হয় না। রুটিন ওয়ার্ক হিসাবে ছয় থেকে ১৮ মাসের মধ্যে দাঁতের স্ক্যালিং করা জরুরি। এতে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

সমস্যাগ্রস্ত আক্কেল দাঁত যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও অনেকে  ফেলতে চান না। এই দাঁত হলো অতিরিক্ত দাঁত। এটা খাবার চিবানোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো কাজেই লাগে না বরং আক্কেল দাঁতের অনিয়মিত অবস্থানের কারণে তা মুখ গহবরসহ পাশের দাঁতের ক্ষতি করে। তাই এগুলো দন্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ফেলে দেওয়াই উত্তম।

পরিশেষে বলা যায়, সহজ কিছু নিয়ম মেনে চললে আমরা মুখ ও দাঁতের যতেœর পাশাপাশি শরীরকেও সুস্থ রাখতে পারি। নিজেদের কর্মময় দিনগুলোকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে পারি। সঠিক নিয়মে দাঁতের যতেœ নিয়মিতভাবে দন্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা সম্ভব। প্রয়োজন সচেতনতা এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা। মিডিয়াগুলো প্রচারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ শিশুর সুন্দর দাঁত ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে।

পিআইডি নিবন্ধ