মত-বিশ্লেষণ

স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত সামাজিক সংগঠনকে উৎসাহ দেয়া প্রসঙ্গে

আখতার হোসেন আজাদ:আমাদের বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে সামাজিক সংগঠনগুলো অন্যতম আস্থা ও ভরসার প্রতীক হিসেবে উদীয়মান হয়েছে। শিক্ষিত সচেতন যুবকরা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে মানবতার কল্যাণের জন্য সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে একত্র হয়ে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালনা করছে।

পূর্বে সচেতন ও মেধাবী যুবকরা পড়ালেখার পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকত। মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লড়ত। কালের বিবর্তনে দেশের রাজনীতি বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার দরুন মেধাবীরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছে। নিজেদের মেধা, শ্রম, কর্মদক্ষতা, চিন্তাশক্তি দিয়ে সমাজের পরিবর্তনের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য সামাজিক সংগঠনসমূহে আকৃষ্ট হচ্ছে। স্বেচ্ছায় রক্তদান, নিরক্ষরদের অক্ষরজ্ঞান প্রদান, পথশিশুদের শিক্ষামুখী করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ, ছিন্নমূলদের শীতবস্ত্র বিতরণ, বিনামূল্যে তরুণদের আইটি প্রশিক্ষণ, খাদ্যে ভেজাল ও ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, বিনামূল্যে আইনি সেবা ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানসহ নানামুখী সেবামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হচ্ছে দেশের বর্তমান মেধাবীরা। সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য সমমনা যুবকরা একত্র হয়ে নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করছে এবং সর্বত্র প্রশংসা কুড়িয়ে আনছে।

সমাজসেবার লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক বা অঞ্চলভিত্তিক গড়ে উঠছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। বাংলাদেশে কী পরিমাণ সামাজিক সংগঠন কাজ করছে বা মোট সংখ্যা কত তার সঠিক তথ্য প্রদান করা সম্ভব নয়। কারণ যুব উন্নয়ন, সমাজসেবা অধিদপ্তর বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিবন্ধিত সংগঠনের বাইরেও অনেক সংগঠন রয়েছে। সামাজিক সংগঠনসমূহের এমন বিস্তৃতি একদিকে যেমন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে আশঙ্কারও সৃষ্টি করছে।

দেশের যুবারা নিজের পরিশ্রম, অর্থ ব্যয় করে সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলে সমাজে সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে; যা সর্বমহলে প্রশংসিত। বর্তমান করোনা মহামারিকালে স্বেচ্ছাসেবক ও সামাজিক সংগঠনসমূহের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সামাজিক সংগঠনসমূহের বিস্তৃতির ফলে মানুষের খুব কাছ থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। রক্তপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে সকল প্রকার সেবা মানুষের দোরগোড়ায় নিমিষেই পৌঁছে যাবে। সাধারণত সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমসমূহ প্রায় একই প্রকার হয়ে থাকে। এতে নিজেদের মধ্যে মধুর প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। ‘তাদের সংগঠনের কাজ ভালো, তোমাদের সংগঠনের কাজও ভালো, তবে আমরা আরও ভালো কাজ করতে চাই’ এমন মনোভাব কাজ করবে।

পৃথিবীর যে কোনো সংগঠনের সদস্যদের সবার চিন্তা, লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও আদর্শ যদি এক না হয়, তাহলে সে সংগঠন সক্রিয়ভাবে কাজ করে সফল হতে পারে না বা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। কিছু কিছু বিষয় সামাজিক সংগঠনসমূহ সম্পর্কে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কেউ সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে অনলাইন পোর্টালে সংবাদ প্রকাশ করার পর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে পদবি যুক্ত করার মাধ্যমেই সে সংগঠনের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখছে। কেউবা আবার পদের লোভে নিজেই সংগঠন খুলে লোক দেখানো গুটিকয়েক কাজ করে অসৎ উদ্দেশ্যে সেই সংগঠনকে ব্যবহার করছে। আবার সামাজিক সংগঠনে অনেক সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আসে। অরাজনৈতিক সংগঠনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে কখনও কখনও সমাজসেবার বদলে রাজনৈতিক সংগঠনের সহযোগী সংগঠন হিসেবেই ব্যবহৃত হতে হয়। আবার কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা নিজেকে মানবতাবাদী ও সমাজসেবক হিসেবে প্রমাণ করার হীন উদ্দেশ্যে সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন বা প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের সুবিধাজনক পদে বলপূর্বক আসীন হন। এতে সামাজিক সংগঠনের যে মৌলিক ও মূল উদ্দেশ্য তা ব্যাহত হয়। এই হার যদি ক্রমেই বর্ধমান হতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে তা নিমিষেই হারিয়ে যাবে; যেমনটি বর্তমান রাজনীতির প্রতি মানুষের মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনগুলোর সদস্যদের মনোভাব হওয়া উচিত সম্পূর্ণ স্বার্থহীন। অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করা, ছাড় দেয়ার মানসিকতা, পদের প্রতি লোভহীনতা বৈশিষ্ট্য নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা উচিত। কখনোই নিজেকে প্রদর্শন করার ইচ্ছে বা নিজ স্বীকৃতি লাভের ইচ্ছে মনের মধ্যে আনয়ন উচিত নয়। স্বেচ্ছাসেবকদের হওয়া উচিত ইটের মতো। একটি দালান বাড়ি করার সময় যেমন কোনো ইটকে গাঁথুনিতে ব্যবহার করা হয়, কোনো ইটকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ঢালাইতে ব্যবহার করা হয়, কোনোগুলোকে মাটির নিচে বিছিয়ে দেয়া হয়। একইভাবে আগুনে পোড়ার পরও এতে যেমন কোনো ইট প্রতিবাদ করে না, ঠিক তেমনই হওয়া উচিত স্বেচ্ছাসেবকদের। সংগঠনের প্রয়োজনে যাকে যখন যেভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়, তার ঠিক সেভাবেই দায়িত্ব পালন করা উচিত। তাদের উচিত পানির মতো হওয়া; যেন যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারা যায়। হওয়া উচিত শিমুল তুলার মতো; নেতিবাচক মন্তব্য এলেও যেন মন নরম করে হাসিমুখে তা মানিয়ে নেয়া যায়।

পরকালীন জীবনের কথা ভেবে কাজ করলে সামাজিক সংগঠন সমূহে প্রদর্শনেচ্ছা গুণটি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। প্রত্যেক ধর্মেই মৃত্যুর পর সকল প্রকার ভালো কাজের প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অনেক পুণ্যবান কাজ। পবিত্র আল কোরআনের সুরা মায়েদার ৩২নং আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কারও প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন পৃথিবীর সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। মহানবী হজরত মুহম্মদ (স.) নিজেই ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক সমাজসেবা ও সংস্কারমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজিতে উল্লেখ আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে, মহান আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করবেন। আবার বুখারি ও মুসলিম শরিফে আরেকটি হাদিসে বিধবা ও অসহায় সাহায্যকারীকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সবকিছুর পেছনে পরিশুদ্ধ নিয়ত বা সংকল্প প্রয়োজন।

বর্তমান হানাহানির পৃথিবীতে স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে বৈশ্বিক শান্তি পুনরায় ফিরে আসবে। মানবতার জয়গান হবে। আবারও সেই দিন ফিরে আসবে; যেদিন সবাই গাইবে ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এটিই প্রত্যাশা।

শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..