সুশিক্ষা

স্মৃতির পাতায় পুরোনো সেই দিনগুলো…

মানুষের জীবনের এক আশ্চর্য বাস্তবতা! প্রত্যেক মানুষেরই স্মৃতির পাতায় জমে থাকে অনেক না বলা কথা। অনেক ভালো লাগা, অনেক কষ্ট-বেদনা, সুখ-দুঃখ যন্ত্রণা সবসময়ই স্থান করে নেয় মানুষের স্মৃতির পাতায়। সবার জীবনই নানা স্মৃতিতে ভরপুর। আমার জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। আমার জীবনের সবচেয়ে সোনালি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বছর। এই তো সেদিন জয়পুরহাট মেস থেকে ট্রেনে চড়ে সুলতান ভাইয়ের সঙ্গে রাজশাহীতে আসলাম। তখন মেহেরচন্ডীর প্রাবাস ছাত্রাবাসে থাকতাম। সেই মেসের অনেক স্মৃতি রয়েছে, যা অল্প কথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমদিন (ভর্তি পরীক্ষার সময়) সোহরাওয়ার্দী হলে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি। তার সঙ্গে বিকালে সাবাস বাংলা মাঠ, টুকিটাকি চত্বর প্রভৃতি ঘুরে দেখি। সেদিন থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে যাই। স্বপ্ন দেখি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার। অবশেষে অনেক পরিশ্রমের পর স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে।
প্রথম ক্লাস শুরু হয় ২০১৪ সালের ১০ মার্চ। অবশ্য সেদিন হাসিমুখে ক্লাস করতে পারিনি। সে গল্পটি না হয় আরেকদিন বলব। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমি শুধু ক্লাসের মধ্যেই থাকতে পারিনি, থাকতে পারিনি শুধু নিজ বিভাগের বন্ধুদের সঙ্গেও। ছুটে গিয়েছি বিভিন্ন বিভাগের বন্ধুদের কাছে। আড্ডা, খেলাধুলা, গান ও পড়ালেখা নিয়ে তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। ছুটে চলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব হতে পশ্চিমে, উত্তর হতে দক্ষিণের সব প্রান্তে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে দিপেন চাকমা, শরীফ উদ্দীন, জাহিদ, ইউসুফ ও বিপ্লবের সঙ্গে কাটানো সময় কখনও ভুলবার নয়। ২০১৫ সাল থেকে শেরে বাংলা ফজলুল হক হলে আবাসিক ছাত্র হিসেবে থাকার সুযোগ পাই। এর আগে বন্ধু দিপেনের সঙ্গে শাহ মখদুম হলে থাকতাম। তার সঙ্গে কতই না মধুর স্মৃতি জড়িত!
বঙ্গবন্ধু হলে ওঠার কথা ছিল। কিছুদিন পর এ হলের ২২৯নং কক্ষে থাকার বন্দোবস্ত হয়। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জীবনের সোনালি চারটি বছর কেটেছে একই কক্ষে। হলের আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, সফেদা, বাতাবি লেবু, নারিকেল প্রভৃতি ফল সবার সঙ্গে মজা করে খেয়েছি। এমনকি হলের কচু ও কাঁঠাল রান্না করে খেতেও বাদ দেইনি। এমনও অনেক দিন গেছে যে হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ নেই, ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবার শেষ। কি করা যায়? খেতে তো হবে। তাই কাঠ জ্বালিয়ে খিচুড়ি রান্না করে খেয়েছি। এসব স্মৃতি কোনোদিনও ভুলতে পারব না।
রাজশাহীতে কখনও গ্রীষ্মের প্রখর রোদে সেদ্ধ হয়েছি। বৈরী আবহাওয়ায় নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে গভীর মমতা আর ভালোবাসায় আমাকে লালিত করেছে তা কোনোদিন ভুলব না। আমার প্রিয় রুমমেট সবুর ভাই, সাজিদ ভাই, ইউসুফ ভাই, আশরাফ, সাদ্দাম রাকিরে সঙ্গে মুড়ি পার্টি ও কার্ড খেলার স্মৃতি কখনও ভুলবার নয়। আমরা সবাই ছিলাম নিজ পরিবারের মতো।
আমার বন্ধুদের সবার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তা থাকবে চিরকাল। ক্যাম্পাসের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি ছিল আমাদের ১০ দিনের শিক্ষা সফরের স্মৃতিগুলো, যা সারাজীবন মনে থাকবে। সর্বশেষ র‌্যাগ ডে ও বিদায় অনুষ্ঠান ছিল অনেক কষ্টের।
সেই দিনগুলোর স্মৃতি মনে পড়লে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। কান্না পায়। বাস্তবতার তাগিদে আমরা বন্ধুবান্ধবরা এখন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছি। তবে কেউ কাউকে ভুলিনি। বাস্তবতা আমাদের শুধু দূরে রেখেছে। হয়ত কোনোদিন আমাদের স্বপ্নের এক জায়গায় একত্রিত করা সম্ভব নয়। তবে যখন যার সঙ্গে দেখা হবে সেই পাঁচ বছরের স্মৃতি ভেসে উঠবে ঠিকই। তখন সেই ক্যাম্পাসের আড্ডা দেওয়া হয়ত সম্ভব হবে না। তবু ভালো লাগা জুড়ে থাকবে।

নাছির উদ্দীন সোহাগ

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..