এসএমই

হাঁসের খামার ঘুরিয়ে দিয়েছে জীবনের মোড়

একটিমাত্র হাঁসের খামারই চুয়াডাঙ্গার জাকির হোসেনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এজন্য তাকে দীর্ঘ ১৭ বছর পাড়ি দিতে হয়েছে। এ সময়ের ব্যবধানে তার পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে। এসেছে একের পর সাফল্য। বলা যায়, এলাকায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন আত্মপ্রত্যয়ী যুবক জাকির হোসেন। তিনি এলাকার প্রায় ৯০টি পরিবারের কর্মসংস্থান করেছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুলপালা গ্রামের জাকির হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবদুর রশীদ মোল্লা ও আজিমুন্নেছা দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে তিনি সপ্তম। তার বাবা ছিলেন বর্গাচাষি। অনেক কষ্টে চলত তাদের জীবন। অভাবের সংসারে বাবাকে সহযোগিতার জন্য ২০০২ সালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে দৈনিক ৫০ টাকা হাজিরায় পানের আড়তে মুহুরির কাজ শুরু করেন। এ আয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। তবু সংসারের চাপ কমাতে কয়েক মাস সেখানে কাজ করে কিছু পুুঁজি সঞ্চয় করেন।
ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির প্রতি তার টান ছিল। এ কারণে পার্শ্ববর্তী রুইতনপুর গ্রামের একটি হাঁসের খামার দেখতে যান। সেখানে স্থানীয় বিলের পানিতে শত শত হাঁস চরে বেড়াতে দেখে হাঁস পালনের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। তখন ওই খামারির কাছে হাঁস পালন সম্পর্কে জানতে চান, কিন্তু অপদস্থ হন। এরপর হাঁস পালনের জেদ চেপে বসে জাকিরের। ওই খামার থেকে ফিরে তিনি দেখা করেন চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অজয় কুমার রায়ের সঙ্গে। তার পরামর্শে জাকির খুলনার আঞ্চলিক হাঁস উৎপাদন খামারে যান সঞ্চিত এক হাজার ৬০০ টাকা নিয়ে। এ টাকায় খাকি ক্যাম্বেল ও জিনডিং জাতের ২০০ হাঁসের বাচ্চা কিনে বাড়ি ফেরেন। এ দেখে প্রতিবেশীরা হাসাহাসি করলেও সেদিকে কর্ণপাত করেননি তিনি। বাড়ির উঠানে গড়ে তোলেন ছোট্ট খামার। পাশাপাশি চলতে থাকে তার লেখাপড়া। ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বিকমে। অল্প সময়ের মধ্যে পরম যত্নে পালন করা হাঁসগুলো ডিম দিতে শুরু করলে স্বপ্ন পূরণ হতে শুরু করে তার। পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘হাঁস জাকির’ নামে।
বর্তমানে তিনি কুলপালাতে ভাইদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘মেসার্স জাকির অ্যান্ড ব্রাদার্স মিক্সড অ্যাগ্রো ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারি’। এখান থেকে প্রতিমাসে তিন লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করেন তারা। আয় হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া এলাকার প্রায় ৫০ বেকার যুবক তার কাছ থেকে হাঁসের বাচ্চা কিনে বিভিন্ন গ্রামে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
ফার্মে খাকি ক্যাম্বেল জাতের ১৫ হাজার ও বেইজিং জাতের পাঁচ হাজার হাঁস রয়েছে। মাছের খামারের প্রতিও নজর দিয়েছেন জাকির। ২০ একর জায়গার ওপর মাছের খামার গড়ে তুলেছেন। আরও রয়েছে ২৮টি গরু। ছাগল ও ভেড়া রয়েছে শতাধিক। এগুলো দেখাশোনা ও পরিচর্যার জন্য খামারে কাজ করেন বেতনভুক্ত ৩২ কর্মচারী।
সফল খামারি জাকির হোসেন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার। তার ফার্ম ও হ্যাচারি দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেকার যুবকসহ ছোট খামারিরা আসেন।

মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা

 

 

সর্বশেষ..