Print Date & Time : 9 March 2021 Tuesday 7:14 am

হাঁস পালনে সমৃদ্ধ হচ্ছে নাটোরের অর্থনীতি

প্রকাশ: December 5, 2020 সময়- 09:34 pm

তাপস কুমার, নাটোর: বর্ষাকালে চারদিকে থই থই করে বন্যার পানি, আর তখনই শুরু হয় হাঁস পালনের প্রস্তুতি। বর্ষার পানি কমতে শুরু করার পর থেকেই হাঁস পালন শুরু হয়। প্রতিদিন ঘুরেফিরে সন্ধ্যার দিকে আবার ঘরেফিরে আসে তারা। এভাবে হাঁস পালনে খরচ কম হওয়ায় চলনবিল অঞ্চলে বাড়ি বাড়ি হাঁস পালনে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠছেন নারীরাও। গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন গৃহিণীসহ খামারিরা।

জানা গেছে, বর্ষাকালে প্রাকৃতিকভাবে সহজেই খাবার পাওয়া যায় বলে হাঁস পালনে তেমন একটা বেগ পেতে হয় না। শামুক, ঝিনুক, মাছ ও পোকামাকড় খেয়ে খুব সহজেই বেড়ে ওঠে এসব হাঁস। তাই এ সময় হাঁস পালনে খাবারের জন্য খুব একটা বাড়তি খরচও গুণতে হয় না। বর্ষায় দেশের বৃহত্তম চলনবিল ও হালতিবিল এলাকার বাড়িতে নিজ উদ্যোগে পারিবারিকভাবেই গড়ে ২০ থেকে ২৫টি করে হাঁস পালন করছেন নারীরা। আবার অনেকে বাণিজ্যিকভাবে ছোট ছোট খামার করে হাঁস পালন শুরু করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমে হাঁস পালনের কারণে একদিকে ডিম উৎপাদন বেশি হয়। আবার নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারজাতও করতে পারেন তারা। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁসগুলো বিক্রি করে বাড়তি টাকাও আয় করতে পারেন তারা।

নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, জেলায় অন্তত এক হাজার ৩৮৯টি গ্রাম রয়েছে। বর্ষার পানি এলেই এসব গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে গড়ে ২০/২৫টি করে হাঁস পালন শুরু করেন। এ হিসেবে প্রতিটি গ্রামে অন্তত ১০০টি পরিবারে হাঁস পালন করা হয়, যার মধ্যে বেশিরভাগই পাতিহাঁস বা দেশীয় জাতের হাঁস রয়েছে। তবে অনেকে রাজহাঁস, চিলহাঁসও পালন করে থাকেন। 

সূত্র জানায়, চলনবিল ও হালতিবিলের ৬৭ হাজার ৫০০ পরিবারে গড়ে ২০টি করে হাঁস পালন হিসাব করলে গড়ে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ হাঁস উৎপান হয় বর্ষাকালেই। এ সময়ে প্রতিটি বাড়িতে গড়ে ১০টি করে ডিম উৎপাদন হলে মোট ডিম উৎপাদন দাঁড়ায় সাড়ে ৬৭ হাজার ডিম, যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় কমপক্ষে ৪৭ কোটি দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। এতে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে নাটোর জেলাকে। 

জেলা প্রাণিসম্পদ সূত্র জানায়, নাটোর জেলায় বাণিজ্যিক ও পারিবারিক এই দুই পদ্ধতিতে হাঁস পালন করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ১৫৯টি খামার নিবন্ধন করা হয়েছে। এ মধ্যে চলতি বছরে নিবন্ধন করা হয়েছে সাতটি। এসব খামারের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। পাঁচ হাজারের বেশি হাঁস থাকলে সেই খামার ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত, তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার হাঁস থাকলে সেটা ‘বি’ শ্রেণির এবং এক হাজার থেকে তিন হাজার হাঁস থাকলে ‘সি’ শ্রেণির খামার। জেলায় ‘এ’ শ্রেণির খামার রয়েছে একটি, ‘বি’ শ্রেণির ২১টি ও ‘সি’ শ্রেণির ২২টি খামার রয়েছে।

হালতির বিলের খোলাবাড়িয়া গ্রামের গৃহিণী হেলেনা বেগম বলেন, বর্ষাকাল এলে তিনি নিজ উদ্যোগে ৫০ থেকে ৬০টি করে দেশি হাঁস পালন করেন। এ সময় হাঁস পালনে তার কোনো বাড়তি খরচ হয় না। এটি বেশ লাভজনক বলে জানান তিনি। 

একই গ্রামের আফরোজা বেগম ও খোদেজা বেগম জানান, বর্ষার সময় হাঁস পালন সহজ ও লাভজনক। শুধু দেখাশোনা আর পরিচর্যা করলেই হাঁস পালন করা যায়। সকালের দিকে হাঁসগুলো পানিতে ছেড়ে দিলে সারাদিন ঘুরে ফিরে খেয়ে সন্ধ্যা হলে দলবদ্ধ হয়ে ঘরে ফিরে আসে। এ জন্য বাড়তি কোনো সময় ব্যয় করতে হয় না।

তবে অনেকে জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের বন্যা বেশি ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় হাঁস পালনে বিঘœ ঘটেছে। অধিকাংশ বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় নিজেদের বসবাসের জায়গাও ছিল না। ফলে অনেকের হাঁস হারিয়ে গেছে বা ভেসে গেছে। আর বন্যাপরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে অনেকেই হাঁস আগেভাগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। 

সিংড়ার চকসিংড়া মহল্লার মোস্তাক আলী জানান, এবারের বর্ষায় প্রায় ৬০০ হাঁস দিয়ে খামার করেছিলেন তিনি। কিন্তু তিন দফার অধিক বন্যার কারণে এবং পানির তোড়ে সিংড়ার শোলাকুড়া বাঁধ ভেঙে বিলীন হয়ে যায় প্রায় ১৫টি বাড়ি। এ সময় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও পাঁচটি বাড়ি। সেই একই রাতে মোস্তাক আলীর ৬০০ হাঁসও ভেসে যায়। পরের দিন কয়েকটি গ্রামে ঘুরে ৩০০ হাঁস খুঁজে পেলেও বাকিগুলো হারিয়ে যায়। এতে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি। একই অবস্থা হয়েছে আরও অনেকেরই।

নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বর্ষাকালে হাওর ও বিলাঞ্চলে হাঁস পালনের মোক্ষম সময়। এ সময়ে হাঁসের খাদ্য সংকট হয় না। প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে হাঁসগুলো বড় হয় এবং ডিম দেয়। এতে ডিমের প্রোটিনের আধিক্য বেশি থাকে। আর বিল অঞ্চলের হাঁস পালন সহজলভ্য হওয়ায় দিন দিন খামারিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

তিনি বলেন, জেলায় দেশীয় প্রজাতির চেয়ে উন্নত খাকি ক্যাম্বেল জাতের হাঁস পালনে খামারিদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। কারণ এ জাতের হাঁস দেশীয় জাতের চেয়ে বছরে ১০০টি ডিম বেশি দেয়, রোগ-বালাই কম হয়। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর হাঁসের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, মৃত্যুর হারও কমেছে। প্রতি বছর ডাকপ্লেগ ও কলেরা রোগে হাঁস মারা গেলেও এবার তেমনটি হয়নি। জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য স্থানের ডিম ও প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।