মত-বিশ্লেষণ

হাঁস পালন করে সচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

শাহনাজ পলি: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ধামসানিয়া ইউনিয়নের অল্প শিক্ষিত ফরিদা খাতুনের ছিল অভাব-অনটনের সংসার। তার স্বামী মানু মিয়া বাড়ির পাশে অল্পকিছু জমি চাষাবাদ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। বছরে একবার চাষাবাদ চললেও বাকি সময়টায় জমিতে পানি জমে থাকে। সংসারের অভাব ঘোচাতে নিকটাত্মীয়ের পরামর্শ নিয়ে দুই সন্তানের জননী ফরিদা হাঁস পালন করার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রধানমন্ত্রীর ‘আমার বাড়ি, আমার খামার প্রকল্প’ থেকে সহায়তা নিয়ে শুরু হয় ফরিদার ভাগ্য বদলের গল্প। এই প্রকল্পের সমিতি থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে তিনি শুরু করেন হাঁসের খামার। ডিম বিক্রি করে প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে সমিতিতে জমা রাখেন। বাড়তে থাকে ফরিদার সঞ্চয় ও আত্মবিশ্বাস। হাঁসের খামারের গর্বিত মালিক ফরিদা তার ঘরে খড়ের চাল বাদ দিয়ে এখন টিনের চাল বসিয়েছেন। শিশুদের স্কুলে দিয়েছেন এবং শূন্য থেকে শুরু করে এখন ফরিদা এজন সফল

প্রান্তিক উদ্যোক্তা।

স্থায়ী তহবিল গঠন করে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দিলে হতদরিদ্র প্রান্তিক নারীও যে স্বাবলম্বী হয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, ফরিদা খাতুন তার বাস্তব উদাহরণ। 

এ প্রকল্পে শুধু ধামসানিয়ার মানুষই উন্নয়ন করেনি, আশেপাশের ইউনিয়নবাসীর সংসারে সুদিন ফিরেছে, ফিরেছে ফরিদার মতো অনেকের ভাগ্য। মূলত বছরের পর বছর ধরে ডুমুরিয়া উপজেলার শোভনা, আটালিয়া ও সাহস ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকার মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতেন। বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কর্মবিমুখ হয়ে বেকার জীবনযাপন করতে হতো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প’-এর অওতায় ওই ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে ৯টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গড়ে তোলা হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, তহবিল সংগ্রহ এবং পারিবারিক খামারের মাধ্যমে দারিদ্র্য নির্মূল ও টেকসই উন্নয়ন। বহুমাত্রিক এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার একদিকে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত করেছে; অন্যদিকে সঞ্চয়কে উৎসাহ প্রদান ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্ম-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছে।

এ প্রকল্পের আওতায় যে কৃষক ফসল ফলান, সুযোগ পেলে তিনিই আবার মাছ চাষ করার সুযোগ পান। তার উঠোনেই বাড়ে হাঁস-মুরগি ও গোয়ালে গরু। সেসব প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াতেই সরকারের এই প্রকল্প আমার বাড়ি আমার খামার।

আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের অধীনে প্রতি গ্রামে গড়ে তোলা একেকটি গ্রাম উন্নয়ন সমিতির দরিদ্র সদস্যরা প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা করেন। প্রত্যেক সমিতিতে রয়েছেন ৬০ সদস্য। এর মধ্যে রয়েছেন ৪০ নারী ও ২০ পুরুষ সদস্য। প্রত্যেক মাসে প্রতি সদস্য ২০০ টাকা করে সঞ্চয় জমা করেন। পাশাপাশি প্রত্যেক সদস্যের অনুকূলে সরকার উৎসাহ বোনাস হিসেবে আরও ২০০ টাকা করে প্রদান করেন।

ধামসানিয়া ইউনিয়নের ৯টি সমিতিতে ব্যক্তি সঞ্চয়, উৎসাহ বোনাস ও ঘূর্ণায়মান ঋণ তহবিল মিলে  যে তহবিল সৃষ্টি হয়েছে, তা উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ হিসেবে দেয়া হয়। ওই এলাকায় সমিতির ৪৬৮ সদস্যের মধ্যে অধিকাংশ সদস্যই ঋণ নিয়ে হাঁস পালন শুরু করে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

সুরুলিয়া গ্রামের সাজিয়া খাতুন জানান, সমিতি থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছয় মাস ধরে তিনি ৫০টি হাঁস পালন করছেন। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫টা ডিম পান। স্থানীয় বাজারে এক হালি ডিম ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করছেন। প্রতিদিন তার এই আয় থেকে পরিবারের খরচ চালিয়ে কিছু জমাতেও পারেন। পাশাপাশি বাড়িতে ডিম থেকে হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে ভালো দামে বিক্রিও করছেন।

সাজিয়া খাতুন আগে স্বামীর সঙ্গে জমিতে কাজ করতেন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন স্বামীও তাকে সাহায্য করছেন। সাজিয়ার মতো পাশের গ্রামের নিলু, সীমা রানি ও রেখা সরকার জানালেন, নারী-পুরুষ সবাই মিলে কৃষিকাজের মধ্যেই তাদের দিন কাটাতে হতো। এখন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে হাঁস পালন করে অনেকটাই ভালো আছেন তারা।

বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ লোক গ্রাম বাস করে। ভূমি ও জনগণ হলো পল্লি অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি। পল্লি অঞ্চলের উন্নয়নের ওপর দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভরশীল। পল্লি অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেক বাড়িকে কেন্দ্র করে অব্যবহৃত জমি, উঠান, পুকুর, ডোবা, খাল প্রভৃতি এবং দক্ষ-অদক্ষ জনশক্তি, বেকার যুবক ও নারী রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পদ ও জ্ঞানের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িকে আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা সম্ভব। দেশের প্রতিটি জমি আবাদের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। 

মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর ইউনিয়নের জয়াইর গ্রামের বেকার যুবক সামাদ উদ্দিন সিদ্ধান্ত নেন তাকে কোনো একটি কাজ করতেই হবে। এ প্রত্যাশা নিয়ে ২০১০ সালের প্রথম দিকে মাদারীপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে তিন মাস মেয়াদি হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ ও মৎস্য চাষবিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তার কর্মজীবন শুরু করেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা যুবঋণ নিয়ে চারটি পুকুর লিজ নেন। প্রাথমিকভাবে মাছ চাষ ও একটি পোলট্রি ফার্ম দিয়ে প্রকল্প শুরু করেন। তার প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে তার কাজের পরিধি। এখন তিনি জায়গা কিনে দুটি পুকুর কেটে মাছ চাষ করছেন। পোলট্রি ফার্মের পরিধি বড় করেছেন। আরও ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এলাকার অনেকেই সামাদের কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে উদ্যোক্তা হচ্ছেন।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ কার্যক্রমের প্রচলন আছে। এই অবস্থায় নির্দিষ্ট সময় পর দরিদ্র মানুষকে উচ্চ সুদে ঋণের টাকা শোধ করতে হয়, যা হতদরিদ্র মানুষের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে দরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তাদের জন্য স্থায়ী তহবিল গঠনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে সরকারের আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প এবং পল্লি সঞ্চয় ব্যাংক।

প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন অনলাইন পল্লি সঞ্চয় ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে বলে একদিকে প্রান্তিক মানুষকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবার আওতায় যেমন আনা যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সম্ভব হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যুবসমাজকে চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারি ব্যাংকগুলো সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করে দিয়েছে। সরকারের এ প্রচেষ্টার পাশাপাশি আমাদের সবার সমন্বিত উদ্যোগে দেশ একদিন সত্যিকার অর্থেই দারিদ্র্যমুক্ত হবে। ফরিদাদের মতো গ্রামীণ নারীরা আত্মনির্ভরশীল হবে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..