প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হবে এক লাখ কোটি টাকা

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট

ইসমাইল আলী: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ২০২৫ সালে হাইস্পিড ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এ রেলপথের দৈর্ঘ্য হবে ২২৭ কিলোমিটার। এ পথে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম যাবে ট্রেন। আর হাইস্পিড ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার। এতে এক ঘণ্টার কম সময়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছা যাবে। এজন্য বিশেষ ধরনের রেলপথ নির্মাণসহ হাইস্পিড ট্রেন চালু করতে ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত খসড়া প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এতে দেখা যায়, ২০২১ সালে নির্মাণ শুরু করলে ২০২৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালু করা যাবে। যাত্রী চাহিদা মেটাতে সে বছর ৪৮ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা যাবে। চাহিদা বাড়লে পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে হবে ২০৩০ সালে ৬০ জোড়া, ২০৩৫ সালে ৭৯ জোড়া, ২০৪০ সালে ৯৪ জোড়া, ২০৪৫ সালে ১১৪ জোড়া ও ২০৫০ সালে ১৪৬ জোড়া।
প্রতিবেদনে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথের জন্য প্রাথমিকভাবে চারটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম রুটটি (ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, পাহাড়তলী হয়ে চট্টগ্রাম) অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ রুটে স্টেশন হবে মোট ছয়টি। ২০২৫ সালে হাইস্পিড ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা হবে দৈনিক গড়ে এক লাখ চার হাজার। ২০৩০ সালে যাত্রীসংখ্যা বেড়ে হবে এক লাখ ২৯ হাজার ৭০০; ২০৩৫ সালে এক লাখ ৬৩ হাজার ৩০০; ২০৪০ সালে দুই লাখ সাত হাজার ৭০০; ২০৪৫ সালে দুই লাখ ৬৭ হাজার ও ২০৫০ সালে তিন লাখ ৪৬ হাজার ৮৫০।
হাইস্পিড ট্রেনের জন্য বিশেষ ধরনের রেলপথের কারিগরি কিছু বৈশিষ্ট্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে রেলপথটি হবে ব্যালাস্টলেস (পাথরবিহীন) কনক্রিটের তৈরি। এছাড়া এমন রেলপথে দুই পাতের মাঝে কোনো ফাঁকা থাকে না। ডাবল লাইনের এ রেলপথের এক্সেল লোড ধরা হয়েছে ১৭ টন। বৈদ্যুতিক এ পথ হবে স্ট্যান্ডার্ডগেজ বা এক হাজার ৪৩৫ মিলিমিটারের।
২২৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার এ রেলপথের ২১৫ দশমিক ৪০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে (এলিভেটেড)। এ রুটের মধ্যে ফেনী থেকে চট্টগ্রাম অংশ বিদ্যমান রেলপথের পাশ দিয়েই নির্মাণ করা হবে। আর ঢাকা থেকে ফেনী অংশ বিভিন্ন শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান বরাবর নির্মাণ করা হবে। আর ছয়টি স্টেশনের মধ্যে কুমিল্লা স্টেশনটি হবে পদুয়ারবাজার থেকে দুই দশমিক ২০ কিলোমিটার দূরে। এছাড়া দ্বিতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত হাইস্পিড রেলপথটি সম্প্রসারণের সুপারিশও করা হয়েছে।
রেলপথটি নির্মাণে বিদ্যমান ১৪০ হেক্টর জমি ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি ৪৯১ হেক্টর জমি নতুন করে অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এ রুটে ট্রেন বা ইএমইউ (ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) চলাচল করবে। আর সামনে-পেছনে ইঞ্জিনযুক্ত বিশেষায়িত এ ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলবে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত। এজন্য নারায়ণগঞ্জের কাছে একটি ইএমইউ ডিপো নির্মাণের প্রস্তাব করা হবে।
হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়েছে, রেলপথের ইমব্যাঙ্কমেন্ট (বাঁধ) নির্মাণে ব্যয় হবে ২৯ কোটি ২০ লাখ ডলার; উড়ালপথ, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে ৩১৬ কোটি ১৯ লাখ ডলার; রেল ট্র্যাক নির্মাণে ৫৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলার; সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপনে ৪০ কোটি আট লাখ ডলার; বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা (ইলেকট্রিফিকেশন) স্থাপনে ৪৭ কোটি ১১ লাখ ডলার; স্টেশন, ভবন ও ওয়ার্কশপ নির্মাণে ৫৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার; অপারেশনাল ইকুইপমেন্ট ও কাঠামো নির্মাণে ৩২ কোটি ৯১ লাখ ডলার; আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে দুই কোটি ৪৮ লাখ ডলার; জেনারেল রিকয়ারমেন্টস আট কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং পরিবেশগত সুরক্ষায় তিন কোটি ৮৮ লাখ ডলার।
এর বাইরে রেলপথ নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ১০৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার; ইএমইউ কেনায় ৯২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার; পরামর্শক নিয়োগে ১৬ কোটি ৩২ লাখ ডলার এবং ভ্যাট ও কর পরিশোধে ১২২ কোটি ৬৪ লাখ ডলার ব্যয় হবে। এছাড়া প্রকল্প ব্যয়ের পাঁচ শতাংশ বা ৪০ কোটি ৮০ লাখ ডলার ভৌত সমন্বয় ও ২০ শতাংশ বা ১৬৩ কোটি ২১ লাখ ডলার মূল্য সমন্বয় বাবদ ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে এক হাজার ১৪৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার বা প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।
নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে ৩২৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার আর বৈদেশিক সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে ৮২১ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, পাঁচ বছরে নির্মাণকাজ শেষে ২৫ বছর রেলপথটিতে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। রেলপথটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ব্যয় হবে প্রায় চার হাজার ১০০ কোটি টাকা। আর কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ টাকা। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া হবে দুই হাজার ২৭২ টাকা। আর বছরে গড়ে রেলওয়ের আয় হবে ১১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।

 

সর্বশেষ..