মত-বিশ্লেষণ

হাতে হাত রেখে চলি

পাঠকের লেখা

আমাদের জীবনযাত্রায় বিড়ম্বনার শেষ নেই। পথেঘাটে আচমকা অকারণে ধাক্কা লাগা তার পরই মানিব্যাগ, ঘড়ি অথবা সেলফোন হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা বিরল নয়। নিঃস্ব ভিখারিকেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

বিড়ম্বনার বহুরূপ। এক বন্ধু বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যচের টিকিট কিনতে ভোরবেলা গিয়ে লাইনে বসে পড়ে। ঝিমুনি আসায় ঘুমিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে ২০ গজ দূরে আবিষ্কার করে; কেউ তাকে কোলে করে সরিয়ে দিয়েছে। পেঁয়াজের দাম নিয়ে চলছে তুলকালাম। লবণের বাজারে গুজব। পত্রিকায় পড়লাম এক পেঁয়াজেই কোনো এক সিন্ডিকেট বাগিয়ে নিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা!

এত বিড়ম্বনার মাঝে তো সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। আবার আমরা কোনো না কোনোভাবে অপরের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াই এবং পরিশেষে অপরের বিড়ম্বনাকেই উদ্যাপন করি বাস্তব জীবনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষই সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার। তাদের দুঃখ-কষ্টের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে চলে দেদার ব্যবসা। বাস্তব জীবনে যে পথশিশুর দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে পথশিশুর ছবিই ভাইরাল হয়। চোখের সামনে ঘটা বর্বরতম নির্যাতনেও যে মুখ বুজে থাকে, সেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবতার শরবত ‘ঢেলে’ দেয়! অনেক স্বনামধন্য আলোকচিত্রী স্বল্প আয়ের মানুষের ছবি তুলে তার সঙ্গে আবেগঘন কথা জুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর বাহবা কুড়ান। বাস্তবিক অর্থে তিনি কিছুই করতে পারেননি মানুষগুলোর জন্য। এক বিখ্যাত বাউল যখন অসুখে ভুগছিলেন তখন তার কোনো শুভাকাক্সক্ষী জোটেনি, কিন্তু মৃত্যুর পর বিভিন্ন প্র্রতিষ্ঠান তার স্মরণে অনুষ্ঠান পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

শীতার্তদের নিয়েও কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। তাদের কষ্টকে ঘিরে আবর্তিত হয় পণ্যের বিজ্ঞাপন! একইভাবে রমজান মাস এলে বিজ্ঞাপন তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিত্তশালী কোনো পরিবারের সন্তানকে দেখা যায় নিজ বাসার কাজের লোক বা তার স্বজনকে ইফতার বা সাহরির সময় দয়া দেখাতে। দয়া দেখানো খারাপ নয়। এই চর্চার দরকার আছে। কিন্তু তা কি শুধু বাণিজ্যের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকবে? এসব মুনাফাভোগী কোম্পানিকে প্রকৃত অর্থে কোনো ফলদায়ক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

বিত্তশালী মানুষ ঈদ এলেই ব্যস্ত হয় লোকদেখানো জাকাত প্রদানে। কোনো নিকটাত্মীয়ের দিকে ফিরে না তাকালেও অন্তত ২০০ জনকে নামকাওয়াস্তে দান করে। তাতে আরও ৪০০ জন জানবে। প্রচার হবে আর কি!

অথচ একটা সমাজে সবাই সমভাবে ভালো থাকার অধিকার রাখে। সবাই সবার বন্ধু, ভাই-ভাইÑধর্মও এমনটা বলে। একজনের ওপর অন্যজন কোনো না কোনোভাবে নিভর্রশীল। তাই সমাজের একাংশ তার আরেকাংশকে চুষে খেলে সেই সমাজ ভালো থাকতে পারে না; ধীরে ধীরে অধঃপতনে ধাবিত হয় এবং একসময় মৃত্যুবরণ করে। গাছের ওপরের অংশ যেমন তার শেকড়কে অস্বীকার করে বাচতে পারে না, তেমনি বিত্তশালীরা খেটে খাওয়া শ্রেণিকে অবজ্ঞা করলে সমাজ টিকে থাকে না।

আমেরিকায় একটি প্রবাদ আছে, ‘যখন শেষ গাছটি কেটে ফেলা হবে, শেষ মাছটি খেয়ে ফেলা হবে, শেষ জলাধারটি বিষাক্ত হবেÑতখন বুঝবে টাকা খাওয়া যায় না।’ জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত স্যাটায়ার রচনা ‘এনিম্যাল ফার্ম’-এ শূকর সম্প্রদায় বলেছিল, ‘সব প্রাণী সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান।’ এমন সমতা অপ্রত্যাশিত। অপরের বিড়ম্বনায় এগিয়ে এসে হাতে হাত রেখে একসঙ্গে চলার সংস্কৃতি চালু হোক।

রাইসুল ইসলাম আকাশ

শিক্ষার্থী

গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..