প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

হারিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের সোনালি শৈশব

কণিকা রানী: শৈশব মানব বিকাশের অন্যতম পর্যায় এবং জৈবিক দিক থেকে এটি জšে§র মুহূর্ত থেকে কৈশোরের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত আচ্ছাদিত। শৈশবের স্মৃতির কথা মনে করতেই চোখের সামনে ভেসে আসে কতনা মধুর স্মৃতি। লুকোচুরি খেলা থেকে শুরু করে, গোল্লাছুট, চি-বুড়ি, কুতকুত, দাঁইড়ে খেলা, সাতধাপ্পা, চোর-পুলিশ খেলা, রাস্তা-পাকে খেলার মতো মজার সব খেলার স্মৃতি। শৈশব প্রতিটি শিশুর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। একটি চমৎকার ও আনন্দময় শৈশব শিশুর অধিকার যা এক প্রকার মানবাধিকারও বটে। শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আনন্দময় শৈশব অত্যন্ত জরুরি। আর এ দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি বর্তায় মা-বাবার ওপর।

একটি শিশুর আনন্দময় শৈশবের সঙ্গে উš§ুক্ত স্থান কিংবা খেলার মাঠ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কোরমা-পোলাও খাওয়ার বাস্তবিক জীবনের থেকে শৈশবের কলার পাতায় পান্তা ভাত আর কাঁচা মরিচের স্বাদ মধুর থেকেও মধুরতর হয়ে থাকে। কিন্তু আধুনিকায়নের যুগে তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল প্রজš§। ছেলেমেয়েদের শৈশবের দুরন্তপনা এখন প্রযুক্তির দেয়ালে বন্দি। যে বয়সে ছেলেমেয়েদের বাধাহীন জীবনযাপন, খেলার মাঠে ছুটে চলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার কথা সে বয়সেই ছেলেমেয়েরা স্মার্টফোনসহ প্রযুক্তিগত বিভিন্ন ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ক্রমশ পরিবর্তনে রূপ নিয়েছে ছেলেমেয়েদের বর্তমান শৈশব।

অচিরেই বর্তমান প্রজš§ ধ্বংস হয়ে যাবে। বর্তমান প্রজšে§র শিশু-কিশোরদের বিনোদনের একমাত্র সঙ্গী হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই এখন গেমিংয়ে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত গেমিংয়ে আসক্তির ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের অনুভূতি। এছাড়া টেলিভিশনের কার্টুন, অ্যানিমেশন, ফেসবুক, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, টুইটারÑএসবে বুঁদ হয়ে আছে বর্তমান প্রজšে§র শিশু-কিশোররা। আমেরিকায় সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কলেজছাত্র দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করে। আমার ধারণা এরকম চিত্র বাংলাদেশেও বিপরীত নয়। পৃথিবীজুড়েই স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের অপুষ্টির হারও বাড়ছে।

ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশই শিশু।  হিসাবে রাজধানীসহ সারাদেশে সাড়ে ছয় কোটির ওপর শিশু রয়েছে। অধিকাংশই বিভিন্ন প্রযুক্তিতে আসক্ত। বাবা-মায়ের কর্ম ব্যবস্থার কারণে শিশুদের বিনোদন দিতে সহজ মাধ্যম হিসেবে বসিয়ে দিচ্ছেন টেলিভিশনের সামনে। কার্টুন দেখতে দেখতে খাওয়া-ঘুম সবই চলছে। টেলিভিশনে কার্টুন পছন্দ না হলে মোবাইল ফোনের ইউটিউবে চলে ভার্চুয়াল জগতে দৌড়ঝাঁপ। অনলাইনে ক্লাস চলায় শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে চলে এসেছে মুঠোফোন। পড়াশোনা থেকে বেশি চলে গেম বা ইউটিউবে। ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত জরিপটির ফলাফল সম্প্রতি ‘পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী ১০১৩ জন শিশুর ওপর জরিপটি করা হয়। এদের কেউ কেউ দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত টিভি দেখে অথবা কম্পিউটারে গেম খেলে। আবার কেউ কেউ এক মুহূর্তও টিভি দেখে না বা কম্পিউটারে খেলে না এমন খুব কম জন এ আছে।  প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজার অর্থাৎ প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে শিশুরা খুব সহজেই ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করে। ৩-৪ বছরের বাচ্চারাও এখন ইউটিউবে নানা ধরনের ভিডিও দেখে। শিশুরা এখন স্মার্টফোনে কার্টুন দেখার নেশায় মেতে ওঠে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শিশুদের প্রায় ৩.৫ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে। 

সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকশ শিক্ষার্থীর ওপর একটি বেসরকারি টেলিভিশন পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর শতকরা ৮০ শতাংশ শিশুই বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ ব্যবহার করছে শুধু বিনোদনের জন্য এবং ৩৬ শতাংশ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। জরিপে আরও দেখা যায়, ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর নিজের স্মার্টফোন আছে। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর।

মুঠোফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শৈশবে সামাজিক এবং মানসিক বিকাশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। যেসব শিশু বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যেমন খেলাধুলা, দৌড় বা সাইকেল চালানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তারা মোবাইল ফোন বা ভিডিও গেমে আসক্ত হয় বেশি। এতে বাধাগ্রস্ত হয় তাদের নানা রকম দক্ষতার বিকাশ। পরে কোনো কিছুতে মনোনিবেশ এবং বাস্তব জীবনে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষমতাও বিঘ্নিত হয়।

আত্মাহত্যা,  ধর্ষণ,  চুরি, খুন, দাঙ্গাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ বেড়ে যাচ্ছে। জীবনের সবচেয়ে মধুর সময় শৈশব। শিশুর শৈশবকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে হলে বেদখল মাঠগুলোকে পুনরুদ্ধার করে শিশুদের জন্য উš§ুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে হলে সুশৃঙ্খল পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একজন শিশু তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করে থাকে। তা ছাড়া প্রচলিত শিশু আইনকে যুগোপযোগী ও শিশুবান্ধব করতে হবে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৪ সালে একটি চিঠিতে অধ্যক্ষ মোহিতচন্দ্র সেনকে লিখেছেন, ‘…ছেলেদের নিয়মিত সাহিত্য চর্চা প্রয়োজন, তার ব্যবস্থা করবেন। প্রত্যেক ছেলের সঙ্গে প্রত্যেক বিষয়েই অর্থাৎ লেখাপড়া রসচর্চা অশনবসন চরিত্রচর্চা ভক্তিসাধন সব-তাতেই আপনি ঘনিষ্ঠ যোগ।’

শিক্ষার্থী

দর্শন বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়