প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

হুন্ডিতে জড়িত এমএফএসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস ব্যবহার করে হুন্ডির মাধ্যমে প্রতি মাসে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকা ও কুমিল্লায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করার পর মঙ্গলবার রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানানো হয়।

সিআইডি জানায়, হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনকারী চক্রগুলো তিন গ্রুপে কাজ করে। প্রথম গ্রুপ বিদেশে অবস্থান করে প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে দেশ থেকে যারা অর্থ পাচার করতে চায়, তাদের দেয়। দ্বিতীয় গ্রুপে পাচারকারী ও তার সহযোগীরা দেশীয় মুদ্রায় ওই অর্থ এমএফএসের এজেন্টকে প্রদান করে। তৃতীয় গ্রুপ তথা এমএফএসের এজেন্ট বিদেশে অবস্থানকারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত এমএফএসের নম্বরে দেশীয় মুদ্রায় মূল্য পরিশোধ করে। সব এমএফএসের আওতায় অনেক ডিস্ট্রিবিউটর আছে। ডিস্ট্রিবিউটররা এজেন্টদের কর্মকাণ্ড নজরদারি করলে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার কমিয়ে আনা সম্ভব।

অর্থ পাচার ঠেকানোর প্রধান উপায় হবে হুন্ডি বন্ধ করা। বিকাশ-নগদ ও রকেটের মতো এমএফএস  প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত পাঁচ হাজার এজেন্ট অবৈধ উপায়ে বিদেশ থেকে অর্থ আনা ও বিদেশে অর্থ পাঠানোয় জড়িত। এর ফলে দেশ বছরে প্রায় ৭৮০  কোটি মার্কিন ডলার বা ৭৫ হাজার কোটি টাকার  রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ডলার-সংকটের জন্য প্রধানত হুন্ডিই দায়ী। ‘হুন্ডি কারবারিরা’ আগে বাসাবাড়িতে গিয়ে গিয়ে নগদ টাকা পৌঁছে দিত। এখন সে ঝুঁকি নিতে হয় না। গ্রাহকের এমএফএস হিসাবের মাধ্যমেই টাকা পৌঁছানো হচ্ছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হুন্ডির টাকা লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধ স্থানান্তরের ফলে ডলারের দাম বেড়ে যায়। ডলার বৈধ পথে এলে দেশের ব্যাংকগুলো ডলার পেত, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও যুক্ত হতো। এরপর আমদানির ক্ষেত্রে সেই ডলার খরচ করা যেত। এখন  রেমিট্যান্সের অর্থ প্রবাসীদের পরিবার পেলেও দেশে প্রকৃতপক্ষে ডলার আসছে না। বরং উল্টো পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থ। হুন্ডি সমস্যা মোকাবিলায় সিআইডিকে খুঁজে বের করতে হবে, কারা এসব এমএফএস এজেন্টদের টাকা দিয়েছে। তাদের থামাতে পারলেই বন্ধ হবে হুন্ডি। একসময় মনে করা হতো, অবৈধ অর্থ বৈধ করতেই অর্থ পাচার করা হয়। এখন সে ধারণাও পাল্টেছে। যে মাধ্যমেই টাকা পাচার হোক না কেন, ব্যাংকের সহায়তা ছাড়া এসব টাকা লেনদেন হয় না।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বহুজাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে চার হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায়  সোয়া চার লাখ কোটি টাকার মতো। এ তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, পাচার কতটা সর্বগ্রাসী। সংকট দূরীকরণে অনিয়ম ও অর্থ পাচার ঠেকাতে সব ধরনের লেনদেনে নিবিড় তদারকি করতে হবে। অর্থ পাচার রোধে কাজ করা সংস্থা বিএফআইইউ’র সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও শূন্য সহনশীল অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। অর্থপাচারে জড়িত ব্যাংক ও এমএফএসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলেই হুন্ডি কার্যক্রম ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব।