সুস্বাস্থ্য

হৃৎপিণ্ড আমাদের বাঁচিয়ে রাখে যেভাবে…

হৃৎপিণ্ড একটা পাম্প মেশিন বা যন্ত্র। মূলত মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন মেশিন এটি। এর চারটি প্রকোষ্ঠ রয়েছে। আজীবন নিয়মিত প্রতি মিনিটে ৭২ বার করে পাম্প করে এটি। দেখে নিতে পারেন হৃৎপিণ্ড কী পাম্প করে? কেন প্রতি মুহূর্তে এভাবে পাম্প করে? পাম্প করে কাকে কী সরবরাহ করে? এর প্রয়োজনীয়তাই বা কী? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে পারলেই আমরা অনেকে হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাব।

ধরা যাক, একজন কৃষক তার ৬০০ একর শুল্ক খরাপীড়িত জমিতে ১০০ ট্রিলিয়ন ধানের চারা জন্মেয়েছেন। তিনি এই চারাগুলোর বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের দিকে সর্বদা সচেষ্ট না হলে কি এগুলো কখনও আপনা-আপনি বেঁচে থাকতে পারবে? কখনোই না। তাকে অবশ্যই পাম্প মেশিন দিয়ে প্রায় প্রতিদিন চারার গোড়ায় পানি ও খাদ্যসহ বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দিতে হবে। চারার খাদ্য হিসেবে বায়ুমণ্ডল থেকে

কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করতে হয়। অন্যথায় চারাগুলো শিগগির মারা যাবে। বিনিময়ে আমরা অক্সিজেন পাই। অর্থাৎ বৃক্ষ নিজে বাঁচার পাশাপাশি আমাদের বেঁচে থাকায় সহযোগিতা করছে। আর আমরা এ মহোপকারী বন্ধুকে নিধন করে দিয়ে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছি। এখানে বৃক্ষ ও মানুষের মধ্যে একটা বিষয় পার্থক্য রয়েছে। যেমন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটা কোষের অক্সিজেন প্রয়োজন। আর একই সঙ্গে প্রতিটা কোষে উৎপাদিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। বৃক্ষ এর বিপরীত কাজটি করে থাকে। বৃক্ষ কাজটি সরাসরি বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে করতে সক্ষম। বৃক্ষ এভাবেই সৃষ্ট, কিন্তু আমাদের সৃষ্টিপদ্ধতি আরও জটিল হওয়ায় আমাদের কোষগুলো বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে ও বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিত্যাগ করতে সক্ষম নয়। তাহলে আমাদের শরীরে কোষগুলো কীভাবে এ কাজটি সম্পাদন করে? হ্যাঁ, হৃৎপিণ্ডই এ কাজটি করে, অর্থাৎ প্রতিটা কোষে খাদ্য, পানীয় ও অক্সিজেন সরবরাহের কাজ রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করে।

হৃৎপিণ্ডের দুই পাশে রয়েছে ফুসফুস, যা রক্ত থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে আবার রক্তে অক্সিজেন মেশায়। ফিরে আসা যাক, কৃষকের কাছে। কৃষকের পাম্প মেশিনটা শুধু পাম্প করলেই ৬০০ ট্রিলিয়ন চারায় সমানভাবে পানি পৌঁছাতে পারে না। এজন্য পাম্প মেশিন থেকে প্রতিটা চারার গোড়ায় সমানভাবে পানি পৌঁছে দিতে আধুনিক প্রযুক্তির পাইপ বা নল লাগাতে হয়। তাহলে বোঝা গেল, অত্যাধুনিক উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন এখানে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন, আমাদের হৃৎপিণ্ডটিও অনুরূপ কাজ করে প্রতি মিনিটে ৭২ বার প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সংকোচন করে। পাম্প করে তার সঙ্গে সংযুক্ত ধমনির মধ্য দিয়ে অসংখ্য শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে আমাদের শরীরে ১০০ ট্রিলিয়ন কোষের প্রত্যেকটিতে রক্ত সঞ্চালন করে। আর এর মধ্য দিয়ে মানবদেহের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন খাদ্য, পানীয়, অক্সিজেন, হরমোন প্রভৃতি সরবরাহ করে। ফলে কোষগুলো আমাদের জীবিত রাখে।

হৃৎপিণ্ড রক্ত সঞ্চালনের প্রধানত অঙ্গ হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অঙ্গটি এ কাজ করতে পারে না। এ কাজে হƒৎপিন্ডকে সহায়তা করে আর কোন কোন অঙ্গ? রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে প্রথমত, বুকের দুই পাশের দুটি ফুসফুস। এরা নিঃশ্বাসের সময় বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন ধমনির রক্তে মিশিয়ে দেয় এবং কোষের মধ্যে তৈরি ক্ষতিকর পদার্থ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শিরায় মিশিয়ে প্রশ্বাসের সঙ্গে বাইরে বায়ুমণ্ডলে বের করে দেয়। দ্বিতীয়ত, ধমনি ফুসফুস থেকে সংগৃহীত অক্সিজেনসহ অন্যান্য সব প্রয়োজনীয় উপাদান কোষে সরবরাহ করে। তৃতীয়ত, কোষের মধ্যে জৈব ক্রিয়া চলাকালে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শিরার রক্তে মিশে যায়। হৃৎপিণ্ড যখন প্রসারিত হয়, তখন শিরার রক্ত হƒৎপিণ্ডের ডান পাশের প্রকোষ্ঠে চলে আসে। এরপর হৃৎপিণ্ড সংকোচন করার মাধ্যমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রশ্বাসের সঙ্গে বের করে দেয়।

হৃৎপিণ্ড সম্প্রসারিত হলে একটি রক্তনালি এর মধ্যে অক্সিজেনমিশ্রিত রক্ত হƒৎপিণ্ডের বাঁ পাশের প্রকোষ্ঠে পাঠিয়ে দেয়। এ প্রকোষ্ঠ থেকে হƒৎপিণ্ডের সংকোচনের সময় একটি মোটা ধমনি শরীরের সব কোষে রক্ত সরবরাহ করে। এতে বোঝা যাবে, হƒৎপিণ্ড ঠিকমতো কাজ করছে। এভাবে হৃৎপিণ্ড অনবরত রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের কোষগুলোয় রক্তের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। বিভিন্ন হরমোন পাম্প করে আমাদের শরীরে সব কোষে পৌঁছে দিয়ে আমাদের জীবিত রাখে। একজন জীবন্ত ব্যক্তির হৃৎপিণ্ডের এই অনবরত সম্প্রসারণ ও সংকোচন স্টেথোস্কোপ বুকে লাগিয়ে আমরা শুনতে পাই। আবার হাত ও শরীরের আরও বিভিন্ন স্থানে ধরে পালস আকারে অনুভব করতে পারি। কোনো মৃত ব্যক্তির হƒৎপিণ্ডে কখনও শব্দ শোনা বা পালস অনুভব করা যায় না। এ কারণে কোনো অজ্ঞান ব্যক্তিকে কৃত্রিম উপায়ে তার হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস চালু রেখে কোষকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে তার স্বাভাবিক মৃত্যু বার্ধক্য আসার আগ পযন্ত সুদীর্ঘকাল অব্যাহত রাখা সম্ভব।

  আইরিন ফাতেমা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..