প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

হয়রানিমুক্ত নতুন আয়কর আইন চান ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আয়কর আদায় করতে গিয়ে কর্মকর্তারা নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন করদাতাদের। হয়রানি কমাতে কর আপিল ট্রাইব্যুনালকে শক্তিশালী করা দরকার। করবিষয়ক অভিযোগ আদালতে যাওয়ার আগেই ট্রাইব্যুনালেই নিষ্পত্তি করা দরকার। একই সঙ্গে কর ট্রাইব্যুনালকে এনবিআরের আওতা থেকে মুক্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার সুপারিশ করেন ব্যবসায়ীরা। নতুন আয়করকে হয়রানিমুক্ত করারও আহবান জানান তারা।

গতকাল ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। ফেডারেশনের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীনের সভাপতিত্বে ‘নতুন আয়কর আইন: জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান।

সভায় অন্যদের মধ্যে এনবিআরের সদস্য পারভেজ ইকবাল, আব্দুর রাজ্জাক ও এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি মুনতাকিম আশরাফ উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ যাতে সহজে আয়কর আইন বুঝতে পারে, সেজন্য নতুন আয়কর আইনের খসড়া বাংলা ও ইংরেজিতে সহজ ভাষায় করার দাবি জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।

সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যবসাবান্ধব নতুন আয়কর আইনের খসড়া প্রণয়নে এনবিআর ও এফবিসিসিআই’র মধ্যে একটি যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এছাড়া কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সব পক্ষের মধ্যে ব্যালান্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন বলেন, মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তাদের বেশি ক্ষমতা থাকায় করদাতা ও ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাই ট্রাইব্যুনালসহ উচ্চ আদালতে দিন দিন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য কর্মকর্তাদের ক্ষমতা কমিয়ে আইনের খসড়া প্রণয়ন করা দরকার। একই সঙ্গে এ আইনের খসড়ায় সবার মতামত নেওয়ার আহŸান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাওয়া সংক্ষুব্ধ করদাতার জন্য একটি সাংবিধানিক অধিকার। উচ্চ আদালতে আপিলের আগেই বিরোধপূর্ণ বিষয়ের করের ২৫ শতাংশ পরিশোধের কথা রয়েছে বর্তমান আইনে। নতুন আইনে এ ব্যবস্থা বাতিল করা উচিত। এছাড়া কর আপিল ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনালকে এনবিআরের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা যেতে পারে। ১৯৮৪ সালের আগে যে আয়কর আইন ছিল, তা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছি। এটা অব্যাহত রাখব। হয়রানিমুক্ত ও করদাতাবান্ধব একটি আইন যাতে করা যায়, সে চেষ্টাই আমরা করছি।

এ সময় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি আয়কর আইন বিষয়ে তাদের অভিমত তুলে ধরেন। ব্যবসায়ীরা বলেন, একই আয়ের ওপর বারবার করারোপ হচ্ছে, এটা আইনের মাধ্যমে দূর করা জরুরি। আগে আয় তারপর করÑএ নীতিকেই মুখ্য ধরে আয়কর ব্যবস্থা গঠনের পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীরা। তারা অভিযোগ করেন, অনেক সময়ই কোম্পানির পণ্য আমদানির পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়। অথচ ব্যবসায় লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে। লোকসান হলে ওই আয়কর ফেরত নিতে গিয়ে অনেক সময়  প্রতিবন্ধকতা পোহাতে হয়। অপর এক ব্যবসায়ী উল্লেখ করেন, কোম্পানির করপোরেট কর জুলাইয়ে ঘোষণা করা হয়। তখন আগের বছরের আয়ের ওপর (রিট্রাসপেক্ট) ওই কর আরোপ করা হয়। আমরা মার্চ মাসে এজিএম করি, এপ্রিলে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করি। এরপর জুলাইয়ে আয়কর আরোপ করলে তা পুরো কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব সৃষ্টি করে। তাই সব ক্ষেত্রেই আয়কর হার ঘোষণার পর সামনের বছরের জন্য কার্যকর করার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ভিত্তিতে বর্তমানে আয়কর আদায় করছে এনবিআর। তবে এখন একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এজন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে সংস্থাটি। ২০১০-১১ সালে বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। পরে এ বিষয়ে ২০১৩ সালে একটি ডিরেক্ট ট্যাক্স কোড প্রণয়ন করা হয়, যা উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সম্পন্ন হয়। পরে ২০১৪ সালে সেটি আরও পরিমার্জিত করা হলেও তা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে মানানসই নয় বলে অনেকে অভিমত দিয়েছেন। এজন্য দেশীয় উদ্যোগে নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি নতুন আয়কর আইন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এনবিআর।