১০ বছরে রেলের লোকসান ১৩ হাজার কোটি টাকা

বিনিয়োগের প্রভাব নেই

ইসমাইল আলী: রেলের উন্নয়নকে বরাবরই গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। এজন্য দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১১ সালের ডিসেম্বরে গঠন করা হয় পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয়। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, নতুন ট্রেন চালুসহ সারাদেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে নেয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা। বেশকিছু বড় প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এত কিছুর পরও ধুঁকে চলছে রেল। বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকসানের পাল্লাও ভারী হচ্ছে সংস্থাটির।

লোকসানের ক্ষতি পোষাতে এক দশকে দুই দফা রেলের ভাড়াও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরপরও প্রতি বছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনে চলেছে সংস্থাটি। এতে মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর গত এক দশকে রেলের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১১-১২ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত রেলের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৪৫২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বছর (২০১১-১২ অর্থবছর) রেলের উন্নয়ন বাজেট ছিল মাত্র এক হাজার ৯০৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অথচ চলতি (২০২১-২২) অর্থবছর সংস্থাটিকে উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক দশকে উন্নয়ন বাজেট বেড়ে প্রায় সাড়ে ছয়গুণ হয়েছে।

এদিকে গত ১০ বছরে রেলের আয় হয় ১০ হাজার ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। একই সময় রেলের পরিচালন ব্যয় ছিল ২৩ হাজার ৫৭৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দশকে রেলের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৪ কোটি সাত লাখ টাকা।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছর রেলের আয় ছিল ৬০৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর ব্যয় ছিল এক হাজার ৫৬৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই অর্থবছর রেলের লোকসান হয় ৯৬৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর ভাড়া বৃদ্ধির পর রেলের আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮০৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয় এক হাজার ৫৬২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এতে রেলের লোকসান কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৭৫৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আর ওই অর্থবছর রেলের বিনিয়োগ ছিল দুই হাজার ৮৭৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

২০১৩-১৪ অর্থবছর রেলের উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পায়। পাল্লা দিয়ে লোকসানও বাড়ে। ওই অর্থবছর রেলে বিনিয়োগ করা হয় তিন হাজার ৫৩৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছর রেলের আয় ও ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৮০০ কোটি ১৮ লাখ টাকা ও এক হাজার ৬০১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এতে রেলের লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৮০১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

২০১৪-১৫ অর্থবছর উন্নয়ন বরাদ্দ কিছুটা কম হয়। ওই অর্থবছর এ খাতে ব্যয় হয় তিন হাজার ৪৩২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর রেলের আয় হয় ৯৩৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ওই সময় রেলের পরিচালন ব্যয় ছিল এক হাজার ৮০৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এতে রেলের লোকসান দাঁড়ায় ৮৭২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। যদিও পরের অর্থবছর রেলের আয় কিছুটা কমে যায়।

পরের অর্থবছরই রেলের লোকসান বেড়ে এক লাফে দেড়গুণ হয়ে যায়। ওই অর্থবছর রেলের লোকসান দাঁড়ায় এক হাজার ৩২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আর সে সময় রেলের আয় ও ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৯০৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ও দুই হাজার ২২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। মূলত নতুন পে-স্কেল কার্যকরের পর রেলের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়া ওই অর্থবছর রেলের উন্নয়ন ব্যয় ছিল চার হাজার ২২০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

আরেক দফা ভাড়ার বৃদ্ধির পর ২০১৬-১৭ অর্থবছর রেলের আয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৩০৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে ব্যয়ও সে বছর অনেকখানি বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৮৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ফলে রেলের লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৫৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা। যদিও ওই অর্থবছর রেলের উন্নয়ন ব্যয় বেড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

পদ্মা সেতু সংযোগ রেলপথ নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প পরের অর্থবছর বাস্তবায়ন শুরু করা হয়। এতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর রেলের উন্নয়ন ব্যয় অনেকটাই বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৫৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ওই অর্থবছর রেলের আয় সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪৮৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এটি রেলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের রেকর্ড। আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৯১৮ কোটি তিন লাখ টাকা। তবে সামগ্রিক লোকসান কিছুটা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৪৩১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

২০১৮-১৯ অর্থবছর রেলের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন গতিতে ভাটা পড়ে। এতে উন্নয়ন ব্যয় কমে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৭৭৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। একই সঙ্গে আয়ও কিছুটা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৪০৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। আর ব্যয় কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এতে লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৬৪৪ কোটি সাত লাখ টাকা।

এদিকে ২০২০ সালে করোনা আঘাত হানে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশও এর থেকে রেহাই পায়নি। ফলে রেলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরও ধীরগতি দেখা দেয়। অর্থবছরের শেষ চার মাস (মার্চ-জুন) উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন প্রায় বন্ধই ছিল। এতে ২০১৯-২০ অর্থবছর রেলের উন্নয়ন ব্যয় কমে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৮৮২ কোটি ৯ লাখ টাকা। ট্রেন বন্ধ থাকায় একই সঙ্গে আয়েও ধাক্কা লাগে রেলের। এতে ওই অর্থবছর সংস্থাটির আয় কমে দাঁড়ায় এক হাজার ১২৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তবে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ১৮৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা রেলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে গত অর্থবছরও রেলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ট্রেন পরিচালনা ব্যাহত হয়। তবে ২০২০-২১ অর্থবছর রেলের উন্নয়ন ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় সাত হাজার ৮৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এ সময় সংস্থাটির আয়ও কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ১৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা। মূলত পণ্য পরিবহন বাড়ায় এ আয় বাড়ে। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন লম্বা সময় বন্ধ থাকায় পরিচালন ব্যয় কমে দাঁড়ায় দুই হাজার ৮১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এতে গত অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান বেশকিছুটা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৬৪২ কোটি ১০ লাখ টাকা।

আয় বৃদ্ধি ও লোকসান কমাতে রেলের পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি ও জমির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা ও রেল-বিষয়ক গবেষক মো. আতিকুর রহমান। শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে বিশ্বের কোনো দেশেই রেলের আয় বৃদ্ধি বা লোকসান কমানো সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারা যাত্রী পরিবহন বৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে লোকসান কমানো ও আয় বৃদ্ধিতে রেলওয়েকে পণ্য পরিবহন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পরিত্যক্ত ও অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধার করে এগুলোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে রেলের আয় দ্রুত বৃদ্ধি করা যাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১৩৫  জন  

সর্বশেষ..