দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

১০ বছরে লোকসান ৪৬১ কোটি টাকা

কর্ণফুলী পেপার মিল

দায়দেনা ও লোকসানে মৃতপ্রায় কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড। যদিও এক সময় দেশের কাগজের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করত এ কোম্পানি। তবে পুরোনো ও অকেজো যন্ত্রপাতি আর অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় এখন ডুবছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ কাগজকলটি। কোম্পানিটির বর্তমান চিত্র, লোকসানের কারণ ও উত্তরণ পরিকল্পনা নিয়ে অনুসন্ধান করেছে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম পর্ব ছাপা হচ্ছে আজ

মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম: মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে দানব আকৃতির দালানগুলো; যেন ভেঙে পড়বে কোনো ঝড়োবাতাসে। মরিচা ধরা যন্ত্রপাতিগুলো পড়ে আছে বিকল। নেই রক্ষণাবেক্ষণ, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জনবল ও কাঁচামাল। ভেঙে পড়েছে  দেয়াল, খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে যন্ত্রপাতি। সর্বোপরি চাহিদা অনুযায়ী নেই উৎপাদন। এভাবেই অযতœ, অবহেলা আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড (কেপিএম)।

দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সিবিএ নেতাদের অরাজকতা, মান্ধাতার আমলের পুরাতন চায়নিজ যন্ত্রপাতিতে ধুঁকে ধুঁকে চলছে এটি। বছর বছর কমছে এর উৎপাদন ক্ষমতা। দায়দেনা আর লোকসানে মৃতপ্রায় ৭০ বছরের পুরোনো রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি।

তথ্যমতে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কর্ণফুলী পেপার মিলস। বছরে উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩০ হাজার মেট্রিক টন কাগজ। এজন্য ২৪ হাজার টন নিজস্ব মণ্ডও তৈরি হতো পেপার মিলটিতে। এতে ২২ রকম কাগজ তৈরি করা হতো। ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। শুরুতে ব্যবস্থাপনা ত্রুটি থাকায় ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার দাউদ গ্রুপের কাছে কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এটি বেসরকারি মালিকানাধীন ছিল।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ২৭ নম্বর আদেশ বলে এটি অধিগ্রহণ করে সরকার। ১৯৭৬ সালে এটি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অন্তর্ভুক্ত হয়। মোট এক লাখ ২৭ হাজার ৫২৯ দশমিক ৬০ একর জমির ওপর কেপিএম অবস্থিত। এর মধ্যে ক্রয়কৃত জমি ৪৮ দশমিক ৪৩ একর, লিজকৃত এক হাজার ২০৪ দশমিক ১৭ একর আর শুধু বাঁশ-কাঠ সংগ্রহের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত জমি এক লাখ ২৬ হাজার ২৭৭ একর।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৫৩-৫৪ অর্থবছরে ১২ হাজার ৯১০ টন দিয়ে উৎপাদন শুরু করে কেপিএম। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো তিন কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা লোকসান গোনে প্রতিষ্ঠানটি। আর গত ১০ অর্থবছরে কেপিএমের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬১ কোটি ৭৭ লাখ সাত হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৪৫ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪০ কোটি ২২ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৮ কোটি ৯ লাখ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬৮ কোটি দুই লাখ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭০ কোটি ৯৪ লাখ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৭ কোটি ২০ লাখ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৫ কোটি ৫৯ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪১ কোটি ২৩ লাখ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কেপিএম লোকসান দিয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কেপিএমের ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬৬ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতি বছরই বাড়ছে কেপিএমের দেনার পরিমাণ। গত আড়াই বছরে এর দেনার পরিমাণ বেড়েছে ১০৭ কোটি চার লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ২০১৭ সালে দেনার পরিমাণ ছিল ৭০৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বর্তমানে কেপিএমের মোট দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৫৭৪ কোটি ৯২ লাখ ও অন্যান্য খাতে ২৩৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

সরকারি খাতের দেনার মধ্যে সুদবিহীন ঋণ পাঁচ কোটি ৭১ লাখ টাকা, সরকারি বিএমআর ১৫২ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, ডিবেঞ্চার ঋণ ১১ কোটি ২৩ লাখ টাকা, অনুৎপাদন খাতে (এডিবি) ১৩ কোটি পাঁচ লাখ, সিইউএফএল ৯ কোটি দুই লাখ টাকা, বিসিআইসির দেনা ৩৫৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ও আন্তঃপ্রকল্প খাতে দেনা ২৬ কোটি সাত লাখ টাকা।

অন্যান্য খাতে দেনার মধ্যে সরবরাহকারীদের দেনা ৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকা, গ্র্যাচুইটি দায় ৮৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা, পিএফ ৬৪ কোটি সাত লাখ টাকা, ক্যাশ ক্রেডিট তিন কোটি ৯৪ লাখ টাকা ও বকেয়া বেতন এক কোটি ৪১ লাখ টাকা।

লোকসানের কারণ সম্পর্কে কেপিএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এমএমএ কাদের শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মিলটি ৭০ বছরের পুরোনো। বর্তমানে এর অবস্থা জরাজীর্ণ। কিন্তু মিলটি আমরা সচল রেখেছি। দায়দেনা প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। আমরা অনেকটা পরিশোধ করেছি। দায়দেনা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আগে (২০১৫-১৬ অর্থবছরে) বছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে বিশেষ মুভমেন্টে মিলকে লাভজনক করার লক্ষ্যে কাজ করছি। এখন লোকসান বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..