প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১০ হাজার মেগাওয়াটের উৎপাদন নেমেছিল ২,৮৩০ মেগাওয়াটে

গ্রিড বিপর্যয়ের ১ ঘণ্টা

ইসমাইল আলী: জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বিপর্যয় হয় মঙ্গলবার দুপুর ২টা ৪ মিনিটে। এতে দেশের চারটি বিভাগ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ৪ ঘণ্টা পুরোপুরি বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল ২৮টি জেলায়। গ্রিড বিপর্যয়ে পূর্বাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমেছিল শূন্যের কাছাকাছি। পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডেও উৎপাদন কমে। সেদিন মাত্র ১ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়েছিল সাত হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট।

গ্রিড বিপর্যয়ের এ ধাক্কা সহজে কাটিয়ে যায়নি। বিপর্যয়ের পর ২ ঘণ্টায় মাত্র তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা যায়। এ সময় গ্রিডে যুক্ত হয় মাত্র ৭২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এরপর উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। আর রাত ১২টা নাগাদ বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও ন্যাশনাল লোড ডেসপাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) মঙ্গলবারের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিলি সেকেন্ডের (এক সেকেন্ডের এক হাজার এক ভাগ) বিচ্যুতি তথা ভুল সিদ্ধান্ত। এতে বিদ্যুৎবিভ্রাট রূপ নেয় বিদ্যুৎ বিপর্যয় তথা গ্রিড বিপর্যয়ে। যদিও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন কেউই।

মঙ্গলবারের বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমবার দিবাগত রাত ১২টায় বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। সকাল ৭টায় তা কমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৩৩ মেগাওয়াট। এরপর কিছুটা করে উৎপাদন বেড়েছে। গ্রিড বিপর্যয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে দুপুর ২টায় সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ছয় মেগাওয়াট। সে সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৩৭ মেগাওয়াট। আর পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট।

ঠিক এর ৪ মিনিট পরই গ্রিড বিপর্যয় শুরু হয়। এরপর দ্রুত কমতে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। দুপুর আড়াইটায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র ৩০ মিনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট কমে যায়। সে সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ১০৩ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে তিন হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট।

যদিও বিদ্যুৎবিভ্রাটের আধা ঘণ্টা পর ২টা ৩৬ মিনিটে আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন চালু করা হয়। তবে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া আটকানো যায়নি। এতে বেলা ৩টায় উৎপাদন সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামে। সে সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে দাঁড়ায় দুই হাজার ৮৩০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ পরবর্তী আধা ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে তিন হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট।

দুপুর ২টা থেকে ৩টাÑএই ১ ঘণ্টায় সারাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাত হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট কমে যায়। সে সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৬৮ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে দুই হাজার ৬৬২ মেগাওয়াট। এ হিসাবে ১ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদন কমে গিয়েছিল পাঁচ হাজার ৮৬৯ মেগাওয়াট। আর পূর্বাঞ্চল গ্রিডের ধাক্কায় পশ্চিমাঞ্চলে কিছুটা উৎপাদন কমে। এতে ১ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে উৎপাদন কমে এক হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট।

সূত্রমতে, মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলের (ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ) বিদ্যুৎ বিপর্যয় শুরু হয় ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি সাব-স্টেশনের মাঝখানে যে ইন্টারকানেকশন (আন্তঃসংযোগ) রয়েছে, সেখান থেকেই। হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে দুই সাব-স্টেশনের আন্তঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে চাপ পড়ে ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যবস্থায়। কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে অন্যান্য সরবরাহ লাইনে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ফ্রিকোয়েন্সি আকস্মিক হ্রাস পায়। সে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি প্রকৌশলীরা। ফলে বিদ্যুৎ বিপর্যয় রূপ নেয় গ্রিড বিপর্যয়ে।

বেলা ৩টার পর থেকে ক্রমান্বয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হয়। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা চালু করতে ৩ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে বলে জানান প্রকৌশলীরা। এতে পরবর্তী ২ ঘণ্টায় খুব বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। ওই সময়ে মাত্র ৭২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয় জাতীয় গ্রিডে। এতে বিকাল ৫টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯৮ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে দুই হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট।

সন্ধ্যা ৬টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ৭৭২ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৩২৯ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে তিন হাজার ৩৯৩ মেগাওয়াট। পশ্চিমাঞ্চলে সে সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় প্রায় রাত ১২টায়।

সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৮০৫ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই হাজার ১৯২ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে তিন হাজার ৬১৩ মেগাওয়াট। রাত ৮টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বেড়ে দাঁড়ায় সাত হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন হাজার ৩২৮ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে তিন হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট।

রাত ৯টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে তিন হাজার ৯৪৯ মেগাওয়াট। রাত ১০টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৩৪ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে চার হাজার ৫১ মেগাওয়াট।

রাত ১১টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৯৯৫ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে চার হাজার ১৮ মেগাওয়াট। রাত ১২টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে। সে সময় বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। ওই সময় পূর্বাঞ্চল গ্রিডে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৪১৩ মেগাওয়াট ও পশ্চিমাঞ্চলে চার হাজার ১০১ মেগাওয়াট।