দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

১১ বিশেষায়িত হাসপাতালের ছয়টিই আগারগাঁওয়ে

আয়নাল হোসেন: পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান ১৮ দিন আগে উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস ও ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। হঠাৎ তার অক্সিজেন লেভেল কমে যায়। তবে করোনা দুই দফা পরীক্ষায় নেগেটিভ আসে। তবে বরিশালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ও বিশেষায়িত সেবা না পাওয়ায় স্বজনরা তাকে ঢাকায় নিয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করেন। এতে তাদের বিপুল অঙ্কের টাকা গুনতে হবে বলে তার ছেলে নুরুজ্জামান মামুন জানিয়েছেন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আম্বর আলী দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কজনিত সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু সেখানে মস্তিষ্কজনিত সমস্যার বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। স্বজনরা বাধ্য হয়েই তাকে নিয়ে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে ভর্তি করেন। এ হাসপাতালে চিকিৎসা ও ওষুধ রোগীকে বিনামূল্যে প্রধান করা হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তার দুজন স্বজন ঢাকায় অবস্থান করছেন। এতে তাদের ব্যয় বাড়ছে। শুধু মনিরুজ্জামান আর আম্বর আলীই নয়, এদের মতো অনেক রোগীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটে আসতে হচ্ছে।

সরকার দেশের সব অঞ্চলে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে ঠিকই কিন্তু চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাজধানীই মানুষের ভরসা। দেশে ১১টি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করেছে সরকার। এদের মধ্যে দেশের ছয়টি বিভাগে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। বিশেষায়িত হাসপাতালের সবকটি রাজধানীতে। আর এদের মধ্যে ছয়টিই হচ্ছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত। এছাড়া মহাখালীতে দুটি, তেজগাঁওয়ে একটি এবং মাতুয়াইলে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এতে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষকে ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। ফলে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমননি ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে। এতে হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন জনগণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক ও জরুরি বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর উপজেলা স্বাস্থ্য কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। এছাড়া উপজেলা থেকে জেলায় রেফার্ড রোগী এবং জেলা থেকে বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় রেফারেল পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে। তাহলে গ্রামীণ জনগণ স্বাস্থ্যসেবা পাবেন বলে মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে ১১টি। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে হচ্ছেÑন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিস অ্যান্ড ইউরোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অফথালমোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থপেডিক্স রিহ্যাবিলিটেশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিস এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব  মেন্টাল হেলথ। এছাড়া রাজধানীর মহাখালীতে রয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজিস অব দ্য চেস্ট অ্যান্ড হসপিটাল ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটাল। তেজগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটি এবং মাতুয়াইলে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড অ্যান্ড মাদার। এছাড়া চট্টগ্রামে রয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিস। খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই।

২০১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে বলা হয়, সবার জন্য প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। সমতার ভিত্তিতে সেবাগ্রহীতা কর্তৃক মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে বলা আছে। কিন্তু সেভাবে সরকার স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তুলেনি। গ্রামীণ স্বাস্থ্য কাঠামো চার স্তরে বিস্তৃত থাকলেও শহরাঞ্চলে তা রাখা হয়নি। গ্রামীণ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছেÑকমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাবসেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতাল। কিন্তু শহরাঞ্চলে কোনো স্বাস্থ্য অবকাঠামো নেই। সামান্য সর্দি-জ্বরের জন্য মানুষ বিশেষায়িত কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় বহুলাংশে বাড়ছে। আগে ব্যক্তিগত খরচ ছিল শতকরা ৬৩ শতাংশ। পরে তা বেড়ে হয় ৬৭ শতাংশ। ব্যক্তির স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম একটি বড় কারণ হচ্ছে, শহরভিত্তিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো। এছাড়া রেফারেল পদ্ধতি মুখে উচ্চারিত হলেও বাস্তবে তা কোথাও নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, উপজেলায় মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনির বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে কার্যকর উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা ছাড়া সম্ভব নয়। উপজেলা থেকে কোনো রোগী সরাসরি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন না। তাদের অবশ্যই জেলা হাসপাতাল হয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করছেন। তাদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে উপজেলা ও জেলাকে কার্যকরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..