প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১১ সিগন্যাল বাতি নিয়ে কাল খুলছে সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ অংশ!

ইসমাইল আলী: বাধাহীনভাবে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতেই সাধারণত নির্মাণ করা হয় ফ্লাইওভার। এজন্য ফ্লাইওভারে কোনো মোড় থাকে না। তাই ফ্লাইওভারের ওপর সিগন্যাল বাতি বসানোর প্রশ্নও আসে না। যদিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। এটির মৌচাক ও মালিবাগ পয়েন্টে ফ্লাইওভারের ওপরেই রয়েছে তিন রাস্তার মোড়। এজন্য দুই পয়েন্টে বসানো হয়েছে মোট ১১টি সিগন্যাল বাতি। আর এগুলো না মানলে যেকোনো সময় ফ্লাইওভারটির ওপরে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ অংশ হলো রামপুরা-মৌচাক-শান্তিনগর। আগামীকাল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ অংশটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে নকশায় ত্রুটি নিয়েই ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ খুলে দেওয়া হয় ফ্লাইওভারটির সাতরাস্তা-হলিফ্যামিলি অংশ। আর গত বছর সেপ্টেম্বরে এর বাংলামোটর-মৌচাক অংশ চালু করা হয়।

সম্প্রতি ফ্লাইওভারটিতে ঘুরে দেখা যায়, রামপুরা থেকে মৌচাক হয়ে শান্তিনগর ও রাজারবাগ অংশটি দুই ভাগে বিভক্ত। এর একটি অংশ তিন তলা, যা রামপুরা রোড থেকে মৌচাক হয়ে একটি র‌্যাম্প শান্তিনগর গিয়ে শেষ হয়েছে। অন্যটি গিয়ে নেমেছে রাজারবাগে। আর দুইতলা অংশটিও বাংলামোটর থেকে মগবাজার, মৌচাক হয়ে দুই র‌্যাম্পে বিভক্ত হয়েছে। এর একটি মৌচাক, মালিবাগ হয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের কাছে শেষ হয়েছে। আরেকটি মালিবাগ থেকে শান্তিনগর গিয়ে শেষ হয়েছে।

মূলত এ অংশটিতেই ত্রুটি সবচেয়ে বেশি। এটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে মৌচাক ও মালিবাগ দুই মোড়েই ফ্লাইওভারের ওপরে তিন রাস্তার মোড় তৈরি হয়েছে। আবার শান্তিনগর থেকে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে রাজারবাগের দিকে যেতে হলেও তিন রাস্তার মোড়ে পড়তে হবে। এ দুই মোড়ে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে ১১টি সিগন্যাল বাতি বসেছে। এর মধ্যে মালিবাগ মোড়ে ছয়টি ও মৌচাক মোড়ে পাঁচটি বাতি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্বোধনের পর ফ্লাইওভার দিয়ে বাংলামোটর থেকে মৌচাক হয়ে শান্তিনগর যেতে চাইলে মৌচাক ও মালিবাগ দুই পয়েন্ট অতিক্রম করতে হবে যানবাহনকে। আবার রাজারবাগ থেকে রামপুরা যেতে হলেও ফ্লাইওভারে পেরোতে হবে মৌচাক ও মালিবাগ মোড়। এতে ফ্লাইওভারটিতে মৌচাক ও মালিবাগে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ ফ্লাইওভারের ওপরে গাড়ির গতি থাকে বেশি। তাই মোড় দুটিতে গতি নিয়ন্ত্রণ না করলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

তারা আরও বলছেন, ফ্লাইওভারটির ওপর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সিগন্যাল বাতি বসানো হয়েছে। তবে সাধারণত এ দেশে সিগন্যাল বাতির মানার প্রবণতা গাড়িচালকদের কম। এতে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। তবে বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে বাস ও মোটরবাইক নিয়ে। কারণ বাস ও বাইকচালকরা বেশিরভাগ সময়ই সিগন্যাল অমান্য করেন। আর সিগন্যাল বাতি যথাযথভাবে মানতে গেলে দিনে বিশেষত ব্যস্ত সময়ে ফ্লাইওভারের ওপরেও যানজট সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ফ্লাইওভারের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে একটি অংশ অন্যটির সঙ্গে মিলে গেছে। এতে দুটি মোড় তৈরি হয়েছে। আর তিন বছর লাগল এ ভুল বুঝতে। এজন্য মোড় দুটিতে সিগন্যাল পদ্ধতি রাখা হয়েছে, যা উড়ালসড়কের ওপরেই যানজট সৃষ্টির কারণ হবে। আর সিগন্যাল ঠিকমতো না মানলে দুর্ঘটনার শঙ্কা তৈরি হবে।

যদিও মাত্র একটি অংশ সংশোধন করলেই এ ঝামেলা থাকত না বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে শামসুল হক বলেন, বাংলামোটর থেকে যে অংশটি মৌচাক এসে মোড় তৈরি করেছে, তা ওপরে তুলে তিনতলা অংশের সঙ্গে যুক্ত করে দিলেই হতো। এতে মালিবাগ ও মৌচাকে কোনো মোড় পড়ত না। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে বাধাহীনভাবে মালিবাগ ও মৌচাক মোড় যানবাহন চলাচল করতে পারত।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে সব ধরনের মোটর যান ডান হাতে চালিত। সে বিষয় বিবেচনায় রেখে নির্মাণ করা হয় সড়ক অবকাঠামো। নকশাও প্রণয়ন করা হয় সে আদলেই। তবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারটি বাঁ হাতে চালিত গাড়ির কথা মাথায় রেখে নকশা করা। সেভাবেই এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ওঠার রাস্তা অনেক বেশি খাড়া হয়ে গেছে। আর নামার অংশটি অনেক বেশি প্রসারিত। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে ডানে মোড় নেওয়ার ব্যবস্থাও নেই। এতে ফ্লাইওভারের আশানুরূপ সুবিধা মিলবে না বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে দুটি পয়েন্টে ডানে মোড় নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আর এ দুই পয়েন্টেই তিন রাস্তার মোড় তৈরি হয়ে গেছে। এছাড়া ফ্লাইওভারটির কারওয়ান বাজার এলাকার র‌্যাম্পটিকে ১৫০ মিটার বর্ধিত করা হয়। এতে রেললাইন পেরিয়ে শেষ হয়েছে র‌্যাম্পটি। অথচ সোনারগাঁও হোটেলের পাশে সড়কটি অনেক সরু। তাই এ সড়কে নিয়মিতই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

ড. সামছুল হক বলেন, সাধারণত সিগন্যাল ও যানজটের ঝামেলা এড়িয়ে ডান দিকের রাস্তায় যাওয়ার সুবিধা করতেই ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। মহাখালী ও খিলগাঁও ফ্লাইওভার এর উদাহরণ। কিন্তু মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকায় ডানে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে ফ্লাইওভারটি যানজট নিরসনে ভ‚মিকা রাখবে না। বরং খাড়া লুপ দিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় পড়তে পারে ফিটনেসবিহীন ও ওভারলোডেড বাস-ট্রাক।

তথ্যমতে, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নকশা ত্রুটির বিষয়টি প্রথম চিহ্নিত করে বুয়েট। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে একাংশ উদ্বোধনের পরদিনই গত ৩১ মার্চ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ত্রুটি খুঁজতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। যদিও ওই কমিটি কোনো প্রতিবেদন এখনও জমা দেয়নি।

এদিকে উদ্বোধনের পর দুবার দুর্ঘটনা ঘটেছে ফ্লাইওভারটি। নামার সময় একবার উল্টে গেছে বাস ও আরেকবার প্রিজন ভ্যান। এতে কয়েকজন আহত হন।

নকশায় ত্রুটির বিষয়গুলো কীভাবে ধরা পড়ল জানতে চাইলে অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারটির নির্মাণকাজের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) লোকজন বুয়েটে এসেছিলেন। ফ্লাইওভারের ডেক (মেঝে) স্থাপনে হিসাবের গরমিল নিয়ে এসেছিলেন তারা। সেটার সমাধান করেছিল বুয়েট। তখনই নকশার বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে যে অভিযোগ আসছিল, তারও সত্যতা পাওয়া যায়। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ যে পর্যায়ে এসব ত্রুটি ধরা পড়ে, তা থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন তিনি।