Print Date & Time : 7 March 2021 Sunday 1:17 am

১২৮ কোটি টাকার বিক্রি ২৫ কোটির রিটার্ন দাখিল

প্রকাশ: January 14, 2021 সময়- 09:21 am

রহমত রহমান: দুই বছরে পণ্য সরবরাহ করেছে প্রায় ১২৮ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু মাসিক দাখিলপত্রে (ভ্যাট রিটার্ন) দেখিয়েছে ২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিক্রয় কম দেখিয়েছে ১০৩ কোটি টাকার বেশি। মূলত ভ্যাট ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি এ বিপুল পরিমাণ বিক্রি কম দেখিয়েছে। ছোট কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, অভিজাত এলাকার অভিজাত ব্র্যান্ড কিংস কনফেকশনারি (বাংলাদেশ) পিটিই লিমিটেড নামের এ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দিতে বিপুল পরিমাণ বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে।

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকার (উত্তর) কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় তথ্য গোপন, ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন ও মামলা করেছেন। সম্প্রতি এ মামলা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কিংস কনফেকশনারি (বাংলাদেশ) পিটিই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম মিয়ার সঙ্গে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘লিখিত জবাব ও ব্যক্তিগত শুনানির আগে আমরা কিছু বলতে চাই না। তবে যত কোটি টাকা বিক্রয় দেখানো হয়েছে, এত কোটি টাকা কখনও বিক্রয় হয়নি।’

এনবিআর সূত্রমতে, কিংস কনফেকশনারি (বাংলাদেশ) পিটিই লিমিটেড বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৩ সালে ‘কিংস কনফেকশনারি’ ব্র্যান্ড হিসেবে কনফেকশনারি ও বেকারি পণ্য (কেক, বিস্কুট, রুটি, পেস্টি, কুকিজ, ফাস্টফুড) উৎপাদন এবং বাজারজাত শুরু করে। মূলত ঢাকা ও বিভাগীয় শহরের বাণিজ্যিক ও অভিজাত এলাকার ক্রেতাদের লক্ষ্য করে এসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু হয়। এসব পণ্যের বেশিরভাগ কাঁচামাল মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় বনানী ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকায় কারখানা অবস্থিত। রাজধানীতে নয়টি, চট্টগ্রাম ও সিলেটে দুটি শোরুম রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি মি. বেকার-এর ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা। ব্র্যান্ডেড প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকিতে নড়েচড়ে বসে এনবিআর। কিংস কনফেকশনারির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির আড়ালে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ পায় এনবিআর। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ভ্যাট ঢাকা উত্তর কমিশনারেটকে নির্দেশ দেয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গুলশান ভ্যাট বিভাগীয় কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহফুজ আলমের সমন্বয়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের একটি টিম গঠন করা হয়।

ওই টিম ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কিংস কনফেকশনারির প্রধান কার্যালয়ে (হাউজ-১৫৩, রোড-১১, বøক-ই, বনানী) অভিযান পরিচালনা করে। তারা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট-সংক্রান্ত দলিলাদি, প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন (সত্যায়িত), বিক্রয়-সংক্রান্ত দলিলাদি জব্দ করেন। জব্দ করা কাগজপত্র যাচাই করে প্রতিষ্ঠান উৎপাদন, সরবরাহ, বিক্রয় ও দাখিলপত্রে ব্যাপক গরমিল এবং ভ্যাট ফাঁকি পান অভিযানকারী ভ্যাট কর্মকর্তারা। পরে একই বছরের ১৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয় (মামলা নং-০২/২০২০)।

মামলার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের ২০১৭ সালের সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বছরে পণ্য সরবরাহ করেছে ১২৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ২০২ টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দাখিলপত্রে পণ্য সরবরাহ ও বিক্রয় দেখিয়েছে ২৪ কোটি ৬০ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯০ টাকা (শোরুমে প্রায় ১৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, কারখানায় প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ)। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি দুই বছরে বিক্রয় কম দেখিয়েছে ১০৩ কোটি ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ২১২ টাকা।

২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির আউটলেট বা শোরুমের দাখিলপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৪ শতাংশ হারে পণ্য সরবরাহ করেছে ৩ কোটি ৯২ লাখ ২৭ হাজার ৯৩১ টাকা; যা ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মোট বিক্রয় মূল্যের ৪১ দশমিক ১৯ শতাংশ। ১৫ শতাংশ হারে পণ্য সরবরাহ করেছে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ২৪২ টাকা; যা ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মোট বিক্রয় মূল্যের ৫৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।

সে হিসাবে দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ ৩২ হাজার ৪৪৯ টাকা। মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৩৭ ও উপধারা (৩) অনুযায়ী ফাঁকি দেয়া ভ্যাটের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রযোজ্য। আইন অনুযায়ী ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২ শতাংশ হারে সুদ ১০ কোটি ১৬ লাখ ২২ হাজার ৪৪৭ টাকা। সুদসহ মোট ভ্যাট ফাঁকি ১৯ কোটি ৭৬ লাখ ৫৪ হাজার ৮৯৬ টাকা। প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাণিজ্যিক দলিলাদি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন চেয়ে ১২ নভেম্বর চিঠি দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ভ্যাট ফাঁকি দেয়ায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও ফাঁকি প্রতিষ্ঠিত হলে দণ্ডারোপের সুপারিশ করা হয়।

সূত্রমতে, মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে ফাঁকি দেয়া ভ্যাট পরিশোধে ২৩ ডিসেম্বর ভ্যাট ঢাকা উত্তর কমিশনার ফারজানা আফরোজ কিংস কনফেকশনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেন। নোটিসের লিখিত জবাব দিতে প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের সময় দেয়া হয়। একই সঙ্গে চলতি বছরের ৯ ফেব্রæয়ারি ব্যক্তিগত শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়। লিখিত জবাব না দিলে এবং নির্ধারিত সময়ে শুনানিতে অংশ না নিলে ভ্যাট আইন অনুযায়ী দাবিনামা চ‚ড়ান্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে একজন ভ্যাট কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ও ভ্যাট রিটার্নে ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। মূলত ভ্যাট ফাঁকি দিতে বিক্রয় তথ্য গোপন করেছে। আমরা যতটুকু পেয়েছি, এর ওপর ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছি। আরও তথ্য চেয়েছি কিন্তু প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করেনি। তবে কিংস কনফেকশনারির মতো একটি ব্র্যান্ডেড প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দিতে বিক্রয় তথ্য গোপনে হতাশ আমরা। আরও ফাঁকি উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছি।’