প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১৫ খাতে বিনিয়োগ সংগ্রহের চাপ!

দেশের অর্থনীতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিনিয়োগকারী

আতাউর রহমান: গত ৬ আগস্ট থেকে সরকার জ্বালানি তেলের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে। এর পর থেকেই দেশের অর্থনীতি এক নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। সবকিছুরই মূল্য বাড়ছে, সেইসঙ্গে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। সবকিছুর মূল্য যখন ঊর্ধ্বমুখী ঠিক তখনই দেশের পুঁজিবাজারে শুরু হয়েছে দরপতনের অস্থিরতা। দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং এর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলোর ব্যয় বাড়বে, একই সঙ্গে কমবে কোম্পানিগুলোর মুনাফা। যেসব কোম্পানি এখন লোকসানে রয়েছে, সেসব কোম্পানির লোকসান বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। বছর শেষে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভালো লভ্যাংশ পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তাই বড় কোনো লোকসানে যাওয়ার আগেই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

গত সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহে চার কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। এ চার কার্যদিবসেই পতন হয়েছে, সেইসঙ্গে কমেছে লেনদেনও। পতনের কারণে গত সপ্তাহে ১৫ খাতে লোকসানে রয়েছে বিনিয়োগকারীরা। এর বিপরীতে রিটার্ন বেড়েছে মাত্র চার খাতে। 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে মোট লেনদেনের সাড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছে ছয় খাতে। এর মধ্যে সবচেয়ে লেনদেন হয়েছে বস্ত্র খাতে। খাতটিতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এরপর যথাক্রমে বিবিধ খাতে প্রায় ১৩ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে ১২ শতাংশ, প্রকৌশলী খাতে আট দশমিক দুই শতাংশ, খাদ্য খাতে সাড়ে সাত শতাংশ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ছয় শতাংশ লেনদেন হয়েছে। আলোচ্য খাতগুলোয় লেনদেন বেশি হলেও শেয়ারদর বেশি কমেছে, যে কারণে লোকসানে থাকা ১৫টি খাতের মধ্যে এ ছয়টি খাত রয়েছে। গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দর কমেছে বিবিধ খাতে। খাতটিতে প্রায় পাঁচ শতাংশ দর কমেছে। এরপর বস্ত্র খাতে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে। যথাক্রমে সাধারণ বিমা খাতে কমেছে ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ, সিরামিক খাতে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ, জীবন বিমা খাতে ২ দশমিক ৮০ শতাংশ, প্রকৌশল খাতে ২ দশমিক ৬০ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে ২ দশমিক ৪০ শতাংশ, ব্যাংক খাতে ২ দশমিক ১০ শতাংশ, আর্থিক খাতে ১ দশমিক ৯০ শতাংশ, আইটি খাতে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ, সেবা খাতে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ, খাদ্য খাতে ১ দশমিক ২০ শতাংশ, ট্যানারি খাতে ১ দশমিক ১০ শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১ শতাংশ এবং সিমেন্ট খাতে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ দর কমেছে। এদিকে টেলিকমিউনিকেশন খাত দর বাড়া ও কমায় সমান ছিল।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতি নিয়ে মানুষের ভেতরে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে সবার। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সবকিছুরই দাম বেড়েছে। এমন অবস্থায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা আছেন বিনিয়োগকৃত অর্থের রিটার্ন নিয়ে সংকটে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কোম্পানিগুলোর ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বছর শেষে মুনাফা কম হওয়ার আশঙ্কায় আছেন সবাই। তাই বড় লোকসানে পড়ার আগে বিনিয়োগকৃত অর্থ সংগ্রহ করে নিচ্ছেন তারা, যা গত সপ্তাহের লেনদেনের চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। সপ্তাহের শুরুতে সূচকের পতন হলেও লেনদেন ছিল হাজার কোটি টাকার ওপরে। তার মানে সপ্তাহের শুরু থেকেই বিনিয়োগ সংগ্রহ শুরু হয়। এতে প্রতি দিনই লেনদেন কমতে থাকে, যে কারণে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে লেনদেন নেমে আসে ৬০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

তারা বলছেন, বিনিয়োগ সংগ্রহের কারণে অনেকেই কিছুটা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন, যে কারণে গত সপ্তাহে ২০টির মধ্যে ১৫টি খাতেই শেয়ারদর বেশি কমেছে। এমনকি জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সেই খাতেও দরপতন হয়েছে। তাই বিনিয়োগ তুলে নেয়ার চাপে গত সপ্তাহে ১৫টি খাতে বিনিয়োগকারীরা লোকসানে রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে সবাই বিনিয়োগ সংগ্রহ করলে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দেবে। সেইসঙ্গে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাজার বিনিয়োগকারী সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে দেশে অর্থনীতি অস্থিরতা রয়েছে। যে কারণে পুঁজিবাজারের এ অবস্থা। বিনিয়োগ সংগ্রহের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবাই যে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে নিচ্ছেন, তা বলা যাবে না। কেউ কেউ পরিস্থিতি দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। পরিস্থিতি কী হয় সেটা দেখে অনেকে বিনিয়োগ করবেন। আবার সবাই বসে আছে সেটাও বলা যাবে না। কিছু মানুষ আবার বিনিয়োগ সংগ্রহ করছেন। তবে কী পরিমাণে ক্যাশ সংগ্রহ হচ্ছে, সেটা আউটফ্লো দেখা গেলে বোঝা যাবে।