প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১৫ বছরে ব্যয় করা হয়েছে ২৭,৫৯২ কোটি টাকা

পদ্মা সেতু প্রকল্প

ইসমাইল আলী: সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণ। ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত ১০টি প্রকল্পের মধ্যেও প্রথমেই রয়েছে এর স্থান। এজন্য কয়েক বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণে। ২০১৩ সালে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণার পর থেকেই চাহিদা অনুপাতে বরাদ্দ দেয়া হয় এ প্রকল্পে। যদিও নানা কারণে কোনো অর্থবছরই প্রকল্পটিতে বরাদ্দকৃত পুরো অর্থ ব্যয় করতে পারেনি সেতু বিভাগ।

সূত্রমতে, পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৭ হাজার ৫৯২ কোটি ২২ লাখ টাকা তথা ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে মূল সেতুর নির্মাণে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, নদীশাসনে আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা, দুই দিকের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণে এক হাজার ৭২১ কোটি ১০ লাখ টাকা, পরামর্শক ব্যয় এক হাজার ৯০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আর জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য ব্যয় ছয় হাজার ৫৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

প্যাকেজগুলোর মধ্যে মে পর্যন্ত মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৯১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা চুক্তিমূল্যের ৯৮ দশমিক ২২ শতাংশ। নদীশাসনে মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে সাত হাজার ৬৫৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা চুক্তিমূল্যের ৮৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। এছাড়া দুই দিকের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণে মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৬৬৫ কোটি দুই লাখ টাকা এবং পরামর্শক খাতে ব্যয় হয়েছে ৮৪০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৬৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

এদিকে এডিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৭ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রথম তিন বছর বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে খুবই কম। সে সময় মূলত নকশা প্রণয়ন ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়। ২০০৭ সালে শুধু সড়ক সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এর আওতায় ২০০৭-০৮ অর্থবছর এডিপি বরাদ্দ রাখা হয় ৩৬ কোটি টাকা। তবে ব্যয় হয় ৩৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

পরের অর্থবছর বরাদ্দ কিছুটা বেড়ে হয় ৩৬৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে ব্যয় হয়েছিল ২৮৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছর পদ্মা সেতু নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া ছিল ৭০০ কোটি টাকা, যা পরে কমিয়ে ২৩৮ কোটি টাকা করা হয়। তবে ব্যয় হয়েছিল আরও কম, ১৯৫ কোটি সাত লাখ টাকা।

রেলপথ সংযোজন ও নকশায় ২০১১ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে নির্মাণব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সে বছর পদ্মা সেতু নির্মাণে ছয় প্যাকেজের পৃথক দরপত্রও আহ্বান করা হয়। মূল নির্মাণকাজ শুরুর জন্য ২০১১ সালেই ঠিকাদার নিয়োগের কথা ছিল। এজন্য ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছর প্রকল্পটির বরাদ্দ বাড়ানো হয়। ওই দুই অর্থবছর এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয় যথাক্রমে এক হাজার ৫৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ও দুই হাজার ১৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

যদিও ২০১১ সালের শেষ দিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক। এতে প্রকল্পটির অগ্রগতি থমকে যায়। বন্ধ হয়ে যায় ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াও। ফলে এডিপির বড় অংশই ব্যয় হয়নি ওই দুই অর্থবছর। এতে ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছর প্রকল্পটিতে সংশোধিত বরাদ্দ দেয়া হয় যথাক্রমে এক হাজার ৩৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ও ৬৩৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয় যথাক্রমে ৩১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ও ৩৭৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

একই ধারাবাহিকতায় নির্মাণকাজের অনিশ্চয়তার কারণে ২০১২-১৩ অর্থবছর পদ্মা সেতু প্রকল্পে এডিপি বরাদ্দ দেয়া হয় ৮০৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বরাদ্দ আরও কমিয়ে করা হয় ৬৬৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয়েছিল ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। তবে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে গতি আসে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে। বাড়ানো হয় এডিপি বরাদ্দও। মূলত এর পর থেকেই প্রকল্পটিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়।

সংযোগ সড়কসহ কয়েকটি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় ২০১৩-১৪ অর্থবছর প্রকল্পটিতে এডিপি বরাদ্দ রাখা হয় ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে মূল সেতুর ঠিকাদার নিয়োগ বিলম্বিত হওয়ায় সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় দুই হাজার ৪২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয়েছিল এক হাজার ৯৬৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

পরের (২০১৪-১৫) অর্থবছর প্রকল্পটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও ব্যয় করা হয়। ওই অর্থবছর এডিপি বরাদ্দ ছিল আট হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে খরচ না হওয়ায় সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে চার হাজার ৫৯৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা করা হয়। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছিল চার হাজার ৫১০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছর এডিপি বরাদ্দ ছিল সাত হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তবে খরচ না হওয়ায় ওই অর্থবছর সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় তিন হাজার ৫৯২ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয়েছিল দুই হাজার ৭৩৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

নকশা জটিলতায় সে সময় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিঘিœত হয়। এজন্য প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ ব্যয় হয়নি। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পদ্মা সেতু নির্মাণে এডিপি বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার ২৬ কোটি ৪৮ টাকা। তবে সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে চার হাজার ৭৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা করা হয়। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছিল তিন হাজার ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছর পদ্মা সেতু প্রকল্পে এডিপি বরাদ্দ ছিল পাঁচ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৬ টাকা। তবে সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় চার হাজার ৭০৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। আর অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছিল দুই হাজার ৭৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

পরের (২০১৮-১৯) অর্থবছর বরাদ্দ ও ব্যয় আরও কমে। ওই অর্থবছর এডিপি বরাদ্দ ছিল চার হাজার ৩৯৫ কোটি ৬৬ টাকা। তবে সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় দুই হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছিল দুই হাজার ৬২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। নকশা জটিলতা অবসানের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গতি আসে। এতে বরাদ্দও বাড়ানো হয় পরের অর্থবছর। ২০১৯-২০ অর্থবছর বরাদ্দ দেয়া হয় পাঁচ হাজার ৩৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে সংশোধিত বরাদ্দ কমে হয় চার হাজার ১৫ কোটি টাকা। আর ব্যয় হয়েছিল তিন হাজার ৯২৭ কোটি ১১ লাখ টাকা।

২০২০ সালের শুরুর দিকে বিশ্বব্যাপী করোনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে চীনে গিয়ে আটকে পড়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বড় একটি দল। এছাড়া মার্চে দেশেও করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন আবারও গতি হারায়। এতে ২০২০-২১ অর্থবছর প্রকল্পটিতে বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বরাদ্দ আরও কমিয়ে করা হয় দুই হাজার ৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আর ব্যয় হয় দুই হাজার ৬৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

চলতি অর্থবছরও প্রকল্পটিতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। তবে সংশোধিত বরাদ্দ কমিয়ে করা হয়েছে দুই হাজার ৪৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। আর মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ১০১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।