নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগের জন্য দেশের পুঁজিবাজার যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সূচকের তথ্য থেকে। মর্গান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনালের (এমএসসিআই) হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় দশকে এ বাজারে বিনিয়োগ করা প্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের হাতে বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৪১ ডলার। অর্থাৎ ডলারের হিসাবে মূলধনের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশই হারিয়ে গেছে। বৈশ্বিক ও অন্যান্য ফ্রন্টিয়ার মার্কেটের তুলনায় এই ধারাবাহিক ক্ষয় বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে গুরুতরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এমএসসিআই’র দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, যেখানে বৈশ্বিক সূচক ৪২৮ দশমিক ৪৯ ডলার এবং ফ্রন্টিয়ার মার্কেটগুলো ২৩৫ দশমিক ৩৫ ডলারে অবস্থান করছে, সেখানে বাংলাদেশের সূচক পড়ে আছে মাত্র ৫০ দশমিক ৩৯ ডলারে। নিট রিটার্নের হিসেবে এই ব্যবধান আরও প্রকট। ২০০৯ সালের নভেম্বর থেকে এমএসসিআই বাংলাদেশ সূচক গড়ে মাইনাস ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক সূচক ১০ শতাংশের বেশি ইতিবাচক রিটার্ন বজায় রেখেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা বাংলাদেশের বাজারকে সমজাতীয় বাজারগুলোর তালিকায় সবার নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারের দর বৃদ্ধি না পাওয়া, তারল্য সংকট এবং টাকার বিপরীতে ডলারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধিÑএই তিনটি বিষয়ই বিনিয়োগকারীদের লোকসানকে বড় করেছে। বিশেষ করে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে স্থানীয় মুদ্রায় কোনো শেয়ারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তা বড় লোকসানে রূপ নিয়েছে। এ ছাড়া ফ্লোর প্রাইসের মতো নীতিগত হস্তক্ষেপ এবং ঘন ঘন নিয়মনীতি পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এমএসসিআই এবং এফটিএসই রাসেলের [লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) একটি অংশ] মতো বৈশ্বিক সূচকগুলোয় বাংলাদেশের অবস্থান সংকুচিত হওয়া এর অন্যতম প্রমাণ।
বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদেশি লেনদেনের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাসিক বিদেশি লেনদেনের পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ মিলিয়ন ডলারে, যা গত অক্টোবর বা নভেম্বরের তুলনায় অনেক কম। ডিসেম্বরে বিদেশিরা প্রায় ১২০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করলেও বিপরীতে মাত্র দুই কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন এবং ব্র্যাক ব্যাংকের মতো বড় মূলধনি কোম্পানিগুলো থেকেই মূলত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের ক্যাশ বা বিনিয়োগ গুটিয়ে নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারের সূচক গণনার পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারগুলোর প্রকৃত চিত্র ডিএসইর সূচকে প্রতিফলিত হয় না। এমএসসিআই’র মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলো ডিভিডেন্ড ইল্ড, লিভারেজ এবং শেয়ারের অস্থিরতাকে প্রাধান্য দিয়ে যে বিশ্লেষণ দেয়, স্থানীয় বাজারে তার প্রতিফলন কম। আসন্ন অর্থবছরগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ ফেরাতে হলে বাজারের কাঠামোগত সংস্কার এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post