প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১৬৬ কোটি টাকা শুল্ককর ফাঁকি মালিক পালিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে

রহমত রহমান: পাঁচ বছরে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল হিসেবে প্রায় ২১৯ কোটি টাকার কাপড় আমদানি করা হয়েছে, যার মধ্যে শুল্ককরই প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা। এ কাঁচামাল দিয়ে কোনো পণ্য তৈরি করা হয়নি। সরাসরি বিক্রি করে দেয়া হয়েছে খোলাবাজারে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে পাঁচ বছর আগে। প্রতিষ্ঠানের মালিক সেই টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সাভার হেমায়েতপুরের ‘কিউ-পয়েন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের মালিক সৈয়দ এইচআর দারা সোহেলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে মালিক পালিয়ে যাওয়ার পর জানা গেল প্রতিষ্ঠানের মালিক শুল্ককর হিসেবে পাওনা ১৬৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেননি। এ শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অপরদিকে ঋণের টাকা তুলতে এ প্রতিষ্ঠান নিলামে তুলেছে একটি বেসরকারি ব্যাংক। তবে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় ফ্যাক্টরি নিলামে বিক্রি করা যায়নি বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

এনবিআর সূত্র জানায়, সাভার হেমায়েতপুরের মুচিপাড়া জামুর এলাকার শতভাগ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কিউ-পয়েন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড। ২০০৬ সালে এ প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়া হয়। লাইসেন্স দেয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতিবছর নিরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ নিয়মিত নিরীক্ষা করার কাজে বন্ড কমিশনারেটকে সহযোগিতা করেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিরীক্ষা করা হয়নি। এছাড়া বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ পায় এনবিআর। বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

সূত্র আরও জানায়, আমদানি-রপ্তানি-সংক্রান্ত দলিলাদি দিতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বন্ড কর্মকর্তারা যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে অ্যাসাইকুডা ও সিআইএস সেল থেকে প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানির তথ্য যাচাই করা হয়, যাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যান্ত ৪৫ লাখ ২০ হাজার ৮৬০ কেজি কাঁচামাল (কাপড়) আমদানি করেছেন। এ কাপড় দিয়ে পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করা হয়েছে কি না, তার কোন তথ্য পাননি বন্ড কর্মকর্তারা।

ধারণা করা হচ্ছে, এ বিপুল শুল্কমুক্ত সুবিধার কাঁচামাল প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এ কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ২১৯ কোটি ২৩ লাখ আট হাজার ৫৮২ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ১৬৬ কোটি ১৭ লাখ আট হাজার ৯৮৭ টাকা। এ শুল্ককর পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছে।

সূত্রমতে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে ২০২১ সালের ২৭ জুন বন্ড কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠান পরিদশর্নে যান। এসময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ পাওয়া যায়। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি না করে অবৈধভাবে অপসারণ ও শুল্ককর ফাঁকি দেয়ায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বন্ড লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ ও বন্ডেড লাইসেন্স বিধিমালার বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। পরে চলতি বছরের প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিস জারি করে বন্ড কমিশনারেট। জবাব দিতে প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের সময় দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো লিখিত জবাব দেয়া হয়নি।

কিউ-পয়েন্ট ফ্যাশনস লিমিটেডের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মিরপুর এলাকায় ছিল। পরে মালিকানা ভাগাভাগি হলে প্রতিষ্ঠানটি হেমায়েতপুর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। প্রায় চার বিঘার বেশি জায়গার ওপর বিশালাকার ভবন নির্মাণ করে ফ্যাক্টরি চালু করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ এইচআর দারা সোহেল। এনআরবি কর্মাশিয়াল ব্যাংক থেকে নেয়া হয় মোটা অঙ্কের ঋণ। সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়নি। ব্যাংক থেকে এরই মধ্যে ফ্যাক্টরি নিলামে তোলা হয়েছে। তবে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় নিলাম সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানের মালিক পাঁচ বছর আগে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রে সোহেলের স্ত্রী চাকরি করেন। আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে বেশিরভাগ সময় পণ্য তৈরি করা হতো না। তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়া হতো। শেষ সময়ে আমদানি করা কাঁচামাল সরাসরি বিক্রি করে দেয়া হতো। সোহেল যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হবেন, সেজন্য টাকা পাচার করে দিয়েছেন বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। পাচার করা টাকা দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠান বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত নিরীক্ষা অনিষ্পন্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছরে ২১৯ কোটি টাকার বেশি পণ্য আমদানি করেছে। আমরা খোঁজ নিয়েও প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির কোন তথ্য পায়নি। আমরা ধারণা করছি, প্রতিষ্ঠান সব কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সময় আমরা জানতে পেরেছি, প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশ ছেড়ে বিদেশে স্থায়ী হয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে সৈয়দ এইচআর দারা সোহেলের ব্যক্তিগত ব্যবহƒত মোবাইল নম্বরের হোয়াসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।