প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১৬ দিনে বাড়ল ৩৭ টাকা কারণ জানে না কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বেড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন শুজ লিমিটেডের। মাত্র ১৬ দিনে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। আর এক বছরে দাম যেন আকাশ ছুঁয়েছে! গত বছরের ১৮ জানুয়ারি থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারদর বেড়েছে ৫৭০ শতাংশ।

কোম্পানির ইতিবাচক খবরে শেয়ারদর বৃদ্ধির ঘটনা অপ্রত্যাশিত নয়। তবে ফরচুন শুজের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ও আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী শেয়ারের এমন দাম বাড়ার ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত বলে মনে করেন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে এমন দর বৃদ্ধি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা আকাশছোঁয়া দর বৃদ্ধির পেছনে কারসাজি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

কোম্পানির সাম্প্রতিক লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মাসের ২৬ তারিখে ফরচুন শুজের প্রতিটি শেয়ার লেনদেন হয় ৯২ টাকা ৩০ পয়সায়। এরপর ক্রমাগত শেয়ারদর বাড়তে থাকে। গতকাল সোমবারও কোম্পানিটির শেয়ারদর এক দশমিক ৬৫ শতাংশ বা দুই টাকা ১০ পয়সা বেড়ে প্রতিটি সর্বশেষ ১২৯ টাকা ৩০ পয়সায় হাতবদল হয়, যার সমাপনী দরও ছিল ১২৯ টাকা ৩০ পয়সা। গতকাল ৩১ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৮টি শেয়ার মোট তিন হাজার ১১২ বার হাতবদল হয়, যার বাজারদর ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। দিনভর শেয়ারদর সর্বনি¤œ ১২৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৩১ টাকা ২০ পয়সায় হাতবদল হয়। সেই হিসাবে এ ১৬ কার্যদিবসে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা বা ৪০ শতাংশ।

এদিকে শেয়ারদর বাড়ার পেছনে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই ফরচুন শুজ লিমিটেডের। সম্প্রতি অস্বাভাবিক দর বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কোম্পানিটি এমন তথ্য জানায়। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অস্বাভাবিক দর বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে ডিএসই নোটিস পাঠায়। জবাবে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারদর বাড়ছে বলে জানায় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

এর আগেও কোম্পানিটির শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে নোটিস পাঠিয়েছে ডিএসই। গত বছরের ৬ জুন কোম্পানিটিকে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। জবাবে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই বলে জানিয়েছিল কোম্পানিটি।

সেই সময়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১ জুন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ২১ টাকা ৬০ পয়সা, যা টানা বেড়ে ৬ জুন লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ২৮ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ চার কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছিল সাত টাকা। এ হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছিল ৩২ শতাংশ।

ডিএসই থেকে ওই সময় সতর্কবার্তা প্রকাশের পরও কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়ার প্রবণতা থামতে দেখা যায়নি। তারপরেই লেনদেন শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে শেয়ারের দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। আর বিক্রেতার ঘর ছিল শূন্য। অর্থাৎ যাদের কাছে কোম্পানিটির শেয়ার ছিল তারা বিক্রি করতে চাননি।

বছরজুড়েই কোম্পানিটির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী ছিল তা এক বছরের লেনদেনের গ্রাফে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে দেখা যায়, গত বছরের ১৮ জানুয়ারি কোম্পানির প্রতিটি শেয়ার বেচাকেনা হয় ১৯ টাকা ৩০ পয়সায়। আর চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি সেটি হাতবদল হয়েছে ১২৯ টাকা ৩০ পয়সায়। ফলে এক বছরের শেয়ারটির দাম বেড়েছে ১১০ টাকা বা ৫৭০ শতাংশ, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয় বলে মনে করেন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ফরচুন শুজ ধারাবাহিক মুনাফা করছে ও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। স্বাভাবিক দর বৃদ্ধি হতেই পারে, কিন্তু যে হারে দর বেড়েছে তা কোম্পানির সামর্থ্যরে বিভিন্ন ইনডিকেটর, যেমনÑইপিএস, অ্যাসেট ভ্যালু, ক্যাশ ফ্লো প্রভৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এদিকে শেয়ারদরের এমন উল্লম্ফনের পেছনে কারসাজির গন্ধ পাচ্ছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। এ বিষয়ে ফিদুল বিশ্বাস নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, তরতর করে যেসব শেয়ারের দাম বাড়ে, বুঝতে হবে সেগুলো নিয়ে গ্যাম্বলিং হচ্ছে। তাছাড়া শেয়ারের দাম এমনভাবে বাড়ে না। গ্যাম্বলিং না হলে শেয়ারের দাম বাড়া-কমার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাড়ে। কিন্তু গ্যাম্বলিং শেয়ারের দাম বিদ্যুৎ গতিতে কারণ ছাড়াই বাড়ে। 

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি হিসাববছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২১) শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে এক টাকা ২৯ পয়সা, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৪৩ পয়সা। এছাড়া ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৫ টাকা ৫২ পয়সা, যা ২০২১ সালের ৩০ জুনে ছিল ১৪ টাকা ২৪ পয়সা। এছাড়া প্রথম প্রান্তিকে তাদের শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থপ্রবাহ হয়েছে ৮০ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৭ পয়সা।

কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ৩০ জুন, ২০২১ সমাপ্ত হিসাববছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আলোচিত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে এক টাকা ৫৯ পয়সা। ৩০ জুন, ২০২১ তারিখে শেয়ারপ্রতি নেট সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ২৪ পয়সা। এছাড়া এ হিসাববছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থপ্রবাহ (এনওসিএফপিএস) হয়েছে এক টাকা ১৬ পয়সা।

এর আগে ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোম্পানিটি পাঁচ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। আলোচিত সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৮০ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৬৩ পয়সা।

কোম্পানিটি ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটেগরিতে লেনদেন হচ্ছে। ২৫০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে পরিশোধিত মূলধন ১৫৪ কোটি ৭৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। রিজার্ভের পরিমাণ ৪৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট ১৫ কোটি ৪৭ লাখ ৯৫ হাজার ৭০৪টি শেয়ার রয়েছে। ডিএসইর সর্বশেষ তথ্যমতে, মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের কাছে ৩০ দশমিক ৯৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫২ দশমিক ৬২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।