প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

১৯৭১ গণহত্যা: জুন

কাজী সালমা সুলতানা :

শেষ পর্ব

শ্রীপুর গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ১৫ জুন নোয়াখালী সোনাপুর রেলস্টেশন-সংলগ্ন শ্রীপুর, সোনাপুর ও মধ্য করিমপুর গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত হয়। এদিন মধ্যদুপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৫-২০টি গাড়ি শ্রীপুর গ্রামের প্রধান সড়কে এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে তারা শ্রীপুর গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের সঙ্গে সেদিন স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ছিল। তাদের মুখ ছিল কালো কাপড়ে বাঁধা।

শ্রীপুরে ঢুকেই হানাদার বাহিনী সর্বপ্রথম আহম্মদিয়া হাই স্কুলের সামনে আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তারা স্কুলের পেছনে তার বাড়িতে গিয়ে ভাই আলী করিম ও আলী হায়দার এবং এক অতিথিকেও গুলি করে হত্যা করে। এ সময় শহিদদের বাবা সৈয়দ মুন্সি গলায় কোরআন শরিফ ঝুলিয়ে ছেলেদের বাঁচাতে অনেক অনুনয়-বিনয় করেন। পাক সেনারা বৃদ্ধ বাবাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে তারই সামনে তার ছেলেদের হত্যা করে, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং লুটপাট করে।

দক্ষিণ সোনাপুরে হোমিও ডাক্তার আবু ফররার দোকানে এক মা তার দুই মাসের অসুস্থ শিশুমেয়েকে নিয়ে ওষুধের জন্য আসেন। ওই সময় হানাদাররা প্রথমে ডাক্তারকে এবং পরে শিশুকন্যা ও মাকে হত্যা করে। ১৫ জুনের শহিদদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী জোশেফ সোয়ারিশও ছিলেন।

সোনাপুর ও মধ্য করিমপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদারদের তাণ্ডবে অসংখ্য বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং নির্যাতনের শিকার হন অনেক মা-বোন। এ হত্যাযজ্ঞে শতাধিক মানুষ শহিদ হন ।

 শ্রীপুর গ্রামে ঢুকতে পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে সোনাপুর ও মধ্য করিমপুরবাসীদের ওপর। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে এ গ্রামের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে ক্ষুব্ধ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মাত্র ২৫ মিনিটের তাণ্ডবে ঝরে পড়ে অর্ধ শতাধিক প্রাণ। শতাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হন, পুড়িয়ে দেয়া হয় প্রায় তিন শতাধিক ঘর এবং সোনাপুর বাজারের বিশাল অংশ।

তিন বিহারির সঙ্গে কয়েকজন পাকিস্তানি দালালের সহযোগিতায় পাক হানাদার বাহিনীর মেজর বোখারীর নেতৃত্বে ঘটানো হয় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সোনাপুর স্টেশন মাস্টার বিহারি এমএম খান মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য পাকিস্তানিদের কাছে পৌঁছানোর অপরাধে এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা তার পুরো পরিবারকে হত্যা করে।

পাকিস্তানি বাহিনী চলে গেলে সন্ধ্যার পর গ্রামবাসী ফিরতে শুরু করে। গ্রামে ফিরে তারা দেখে শুধু লাশ আর লাশ। বাড়িঘর আগুনে পোড়ানো। তারা যখন পরিবারের লাশগুলো সৎকারের প্রস্তুতি নিতে থাকে, তখন তারা শুনতে পায় পাক বাহিনী আবারও গ্রামে আসছে। লাশ রেখেই সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, যদিও সে রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আর আসেনি।

পরদিন ভোরে ফিরে তারা যাকে যেখানে সম্ভব হয়েছে দাফন করেছেন। তবে শহিদদের কবরগুলো চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করার জন্য সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি এবং অনেকের পরিবারের পক্ষেও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

১৫ জুনের গণহত্যা স্মরণে শ্রীপুর আহম্মদীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ৪৮ জনের নাম-পরিচয়সহ ‘স্মৃতি অম্লান’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে নোয়াখালীতে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনজনকে ফাঁসি এবং অপর একজনকে ২০ বছর কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন।

কান্দাপাড়া গণহত্যা: ১৮ জুন রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে রাজাকারদের বড় একটি দল বাগেরহাটের কান্দাপাড়া বাজারে পৈশাচিক গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শহিদ হন ২৩ জন। ১৮ জুন শুক্রবার। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কান্দাপাড়া ও আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষ জুমার নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময় রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে রাজাকারদের বড় একটি দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে একদল বাগেরহাট থেকে মুনিগঞ্জ খেয়া পার হয়ে বাগেরহাট-চিতলমারী সড়কপথে অগ্রসর হতে থাকে। অন্যপাশে আরেকটি দল ফকিরহাটের মুলঘর থেকে কুচিবগা খালের পথে আসে। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা এসময় গ্রামে ও বাজারে ঢুকে তাদের বাড়িতে এসে হাজির হয়। তারা তাদের বাড়ি লুটপাট করে অভিযুক্তদের কান্দাপাড়া বাজারে আনে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী দেলোয়ার হোসেন মাস্টার ও ইব্রাহিম হোসেন মাস্টারকে বাড়িতে না পেয়ে তাদের বাড়ি গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে। রাজাকারদের আরেকটি দল ততক্ষণে কদমতলা গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন সহযোগীকে ধরে আনে। মোট ২৫ জনকে ধরে আনার পর তখন সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রাজাকারেরা ১৮ যুবক, তিন বৃদ্ধ ও দুই শিশুকে জবাই করে মাথা বিচ্ছিন্ন করে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখে। ২৫ জনের মধ্যে মঞ্জুর মোল্লা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে জান।

হরিপুর গণহত্যা: ২২ জুন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় ফেনীর ছাগলনাইয়ার হরিপুর গ্রামে। মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তথ্য দিতে রাজি না হওয়ায় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহযোগিতায় পাকিস্তানি হায়নারা নয় সাধারণ মানুষকে অমানুষিক নির্যাতন করে এবং ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।

২২ জুন সকালে ১০-১৫ জনের বেশি পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ছাগলনাইয়ার বাংলাবাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে আসে। তখন রাস্তায় গরু নিয়ে যাওয়া অবস্থায় তারা তাহেরকে ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি কোনো তথ্য দিতে না পারলে তাকে গরুর দড়ি দিয়ে সেখানে বেঁধে রাখে। এরপর পাক সেনারা রেজুমিয়া ব্রিজের পাশে বাঁশপাড়া গ্রামের বতু মিয়া ও তার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তারা বাংলাবাজার রাস্তার পাশে নয়জনকে ধরে হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখে। এরপর আরও চার বয়স্কলোককেও ধরে আনে। পাক সেনারা সব পথচারীর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেনারা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা তরুণদের ওপর নির্যাতন করে। তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য না পাওয়ায় তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা শুরু করে। নয়জনকে হত্যা করে তাদের লাশ ফেনী ছাগলনাইয়া মহাসড়কের পাশের ডোবায় ফেলে দেয়। তিন দিন পর্যন্ত লাশগুলো ডোবায় পড়ে ছিল। তখন পাঞ্জাবিদের অনুমতি ছাড়া লাশ দাফন করা যেত না। দুই দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী লাশগুলো দাফনের জন্য দুই ঘণ্টা সময় দেয়। পচা-গলিত লাশগুলোকে কোনো কাফন ও গোসল ছাড়া গর্তের মধ্যে মাটি চাপা দেয়া হয়। হরিপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতে চলে যান।

১৯৭১ সালে এদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের নির্মম ঘটনা। সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন অসংখ্য নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেও হার মানায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের আমরা যেন ভুলে না যাই। তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান চিরজাগ্রত থাকুক।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ইন্টারনেট

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]