২০০ বছরেও জনপ্রিয়তা হারায়নি করটিয়া হাট

এনায়েত করিম বিজয়, টাঙ্গাইল: দেশের প্রাচীন ও বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী হাটগুলোর মধ্যে অন্যতম টাঙ্গাইলের করটিয়া হাট। এই হাটটি দুই শতাধিক বছরের পুরোনো। তারপরও এখনও সেই আগেই মতোই হাটে মানুষের সমাগম হচ্ছে।

এই হাট তুলনামূলকভাবে কম দাম ও বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ির প্রাপ্তিস্থান হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতের পাইকারি শাড়ি ব্যবসায়ীদেরও অন্যতম পছন্দ এই হাটটি। বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন বসে করটিয়া হাট। সপ্তাহের মঙ্গলবার ভোর থেকে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে শেষ হয়। এসময় দিনে ও রাতে চলে কেনাবেচা। সপ্তাহে ২০০-৩০০ কোটি টাকার কেনাবেচা চলে এই হাটে।

দেশের প্রাচীন ও বৃহৎ কাপড়ের করটিয়া হাটকে উদ্দেশ করে অনেক আগে থেকেই টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা বংশপরম্পরায় তৈরি করছেন নানা ধরনের কাপড়। সে কাপড় দেশ-বিদেশের ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে করটিয়া হাটের বিক্রেতাদের মাধ্যমে। টাঙ্গাইল শাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই হাটের ইতিহাস। প্রাচীনকালে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা মসলিন শাড়ি বুনতেন। এর সার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে আজও টিকে রয়েছে টাঙ্গাইলের জামদানি, বেনারসি ও তাঁতের শাড়ি। দেশ ভাগের আগে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির বাজার বসত কলকাতায়। টাঙ্গাইলের তাঁতিরা চারাবাড়ী, পোড়াবাড়ী, নলছিয়া ঘাট ও সুবর্ণখালী বন্দর থেকে স্টিমার, লঞ্চ ও জাহাজে চড়ে কলকাতায় যেতেন। দেশ ভাগের পর টাঙ্গাইল তাঁতের প্রধান হাট ছিল জেলার বাজিতপুরে। শুধু দেশি পাইকাররাই নন, ভারত ও ইংল্যান্ড থেকেও শাড়ি কিনতে আসতেন ক্রেতারা। টাঙ্গাইল শাড়ির এমন চাহিদা আর দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের আগমন দেখে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত করটিয়া জমিদার পরিবার একটি হাটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। পন্নী পরিবারের সদস্য ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়া টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়ায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর ‘মাহমুদগঞ্জ’ নামে এই হাটটি প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় করটিয়া ছিল একটি নদীবন্দর এলাকা। সেখানে সপ্তাহজুড়ে হাট বসত। শাড়ির পাশাপাশি গবাদিপশু, হাতে তৈরি তৈজসপত্রসহ নানা সামগ্রী বিক্রি হতো। প্রতিষ্ঠার পর পাট ও গবাদিপশুর জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে এ হাটটি। পরবর্তী সময়ে টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই হাট। সে সময়ের জনপ্রিয় যাতায়াত মাধ্যম ছিল নদীপথ। মাহমুদগঞ্জ নামে হাটটি প্রতিষ্ঠা করা হলেও মানুষের কাছে করটিয়া হাট নামেই পরিচিতি পেয়েছে।

এদিকে হাটে খোলা মাঠে শাড়ি বিক্রির পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে অর্ধশতাধিক বহুতল মার্কেট। টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি প্রিন্টের শাড়িও পাওয়া যায় এখানে। প্রতি হাটবারে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। বিক্রি হয় হাজার হাজার শাড়ি, লুঙ্গি, চাদর, থ্রিপিস ও শাল। ঢাকার ইসলামপুর, নরসিংদীর বাবুরহাট, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও এনায়েতপুর থেকে শাড়ি আসে এই হাটে। বর্তমানে শাড়ি ও শালের পাশাপাশি লুঙ্গি, চাদর, থ্রিপিস ও শিশুদের পোশাক পাওয়া যায় এখানে। পাইকারির পাশাপাশি চলে খুুচরা বিক্রিও। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এ হাটের যোগাযোগব্যবস্থাও সন্তোষজনক। পণ্য কেনার পর সহজে ক্রেতারা ক্রয় করা পণ্য পরিবহনে নিয়ে যেতে পারেন। তাই ক্রেতাদের পছন্দের তালিকার প্রথম দিকেই রয়েছে করটিয়া হাটটি।

টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী আব্দুল মোত্তালিব বলেন, ‘হাটটি অনেক পুরোনো। এটা টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য। আমি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে এ হাটে শাড়ি বিক্রি করে আসছি। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও পাইকাররা আসে শাড়ি কিনতে। হাটে এখনও সেই আগের মতোই ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। এখানে কাপড়ের দাম তুলনামূলকভাবে কম। এজন্য মানুষ এ হাটে শাড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই হাটে দুই দিনে আমার প্রায় ১০ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হয়। 

শাড়ি ব্যবসায়ী উত্তম কুমার সরকার বলেন, ‘এই হাটে রংপুর, বরিশাল, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নরসিংদীর বাবুরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও পাইকাররা আসে শাড়ি কিনতে। এই হাটে সবকিছুর দাম তুলনামূলকভাবে কম। এখনও হাটটি সতেজ রয়েছে। মানুষের সমাগম হয় আগে মতোই।’

শাড়ি ব্যবসায়ী হাসান মিয়া বলেন, ‘করোনার সময় হাটটি বন্ধ ছিল। এখন পুরোদমে হাট চালু হয়েছে। হাটে আগের মতোই মানুষের সমাগম হয়। দেশজুড়ে করটিয়া হাটের সুনাম রয়েছে। এজন্য বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও পাইকাররা আসে কাপড় কিনতে। হাট কমিটির ব্যবস্থাপনাও ভালো। এখানে নিরাপদে হাট করা যায়।’

শাড়ি ব্যবসায়ী পলাশ সরকার বলেন, ‘আমি করটিয়া হাটে প্রায় এক যুগ ধরে শাড়ির ব্যবসা করি। হাটে নিরাপদে কাপড় বিক্রি করা যায়। হাটে দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসে। ঐতিহ্যবাহী এ হাটে অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়। বর্তমানে মঙ্গলবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত হাট বসে।’

করটিয়া হাট কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জিন্নাহ বলেন, ‘প্রায় ২০০ বছর আগে করটিয়া জমিদার পরিবারের সদস্য ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়া করটিয়ায় প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর এই হাটটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন হাটটির নাম ছিল ‘মাহমুদগঞ্জ’। এখন এই হাটটি করটিয়া হাট নামেই পরিচিত। তবে এখনও কাগজপত্রে ‘মাহমুদগঞ্জ’ লেখা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও হাটে ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। এখনও আগের মতোই হাটে মানুষের সমাগম হয়। তবে হাটে অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ করায় পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। খোলা বাজারেও জায়গা কমে গেছে।’ করটিয়া হাট কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ শাহজাহান আনছারী বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী করটিয়া হাটটি অনেক পুরোনো। পন্নী পরিবারের সদস্যরা হাটটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হাটে দিনরাত বেচাকেনা চলে। হাটে এখনও অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়। হাটের ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় পুরো হাট সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া হাটের নিরাপত্তায় নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকও আছে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯২৭৩  জন  

সর্বশেষ..