প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

২০২০ সালের আগে শেষ হচ্ছে না পদ্মা সেতুর কাজ

ইসমাইল আলী: পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণে চুক্তি সই হয় ২০১৪ সালের জুনে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে এ কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে ২০২০ সালের আগে শেষ হচ্ছে না পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। কারণ নির্মাণ শেষ করতে অতিরিক্ত ২৩ মাস সময় চেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মূল সেতুর কাজ পিছিয়ে আছে ২৫ শতাংশের বেশি। যদিও সর্বশেষ অগ্রগতি না বেড়ে উল্টো কমে গেছে।

এদিকে প্রকল্পটির নদী শাসন প্যাকেজের চুক্তি সই হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। বর্তমানে এ অংশের বাস্তবায়ন পিছিয়ে আছে প্রায় ৩০ শতাংশ। নদী শাসন শেষ করতে অতিরিক্ত ১৮ মাস সময় চেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন। পদ্মা সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় রেন্ডাল অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস।

এতে বলা হয়, চলতি বছরের অক্টোবর শেষে মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৪৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। যদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে মূল সেতুর কাজ। তবে এটি বাস্তবিক অগ্রগতির হার নয়। আর্থিক অগ্রগতির ভিত্তিতে এটি হিসাব করা হয়েছে। যদিও অক্টোবরে অগ্রগতি এক দশমিক ৭৪ শতাংশ কমিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ। কারণ সেপ্টেম্বর শেষে মূল সেতুর অগ্রগতি দেখানো হয়েছিল ৪৮ দশমিক ৯০ শতাংশ।

এদিকে অক্টোবর পর্যন্ত নদী শাসন কাজের বাস্তবায়নের হার ৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ। যদিও এক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে নদী শাসনের কাজ। তবে এটিও বাস্তবিক অগ্রগতির হার নয়। আর্থিক অগ্রগতির ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। তবে নদী শাসন প্যাকেজের প্রতিটি অংশের কাজে বিলম্ব রয়েছে। যদিও এর কোনো কারণ বা সমাধানের কোনো পথ উল্লেখ করেনি ঠিকাদার।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর মূল সেতু নির্মাণে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তবে গত ১৪ নভেম্বর ঠিকাদারের পক্ষ থেকে সংশোধিত কর্মপরিকল্পনা দাখিল করা হয়। পরে তা পর্যালোচনাপূর্বক ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) জমা দেয় ব্যবস্থাপনা পরামর্শক।

এতে দেখা যায়, মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে ২৩ মাস অতিরিক্ত সময় লাগবে। অর্থাৎ ২০২০ সালের অক্টোবরে নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ঠিকাদার। ফলে প্রস্তাবটি ফেরত দিয়েছে বিবিএ। যদিও প্রকল্পটির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ গত মাসে সাড়ে তিন হাজার কিলোজুল ক্ষমতার একটি হ্যামার যুক্ত করেছে। তবে সেতুটির ১৪টি পিলারের নকশা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে প্রকল্পটির নদী শাসনের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। তবে প্যাকেজের ঠিকাদার চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন কাজটি শেষ করতে আরও ১৮ মাস সময় অতিরিক্ত দাবি করে। গত ১০ অক্টোবরে এ প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। এতে ২০২০ সালের জুনে প্যাকেজটির কাজ শেষ হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছে।

জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা হয়েছে। এজন্য মাসভিত্তিক অগ্রগতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও ঠিকাদাররা বাড়তি সময় চেয়েছে। তবে তাদের বাড়তি সময় প্রদান করা হয়নি। বিদ্যমান চুক্তিতে এর কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারদের বাড়তি সময় দেওয়া হবে কি না, নাকি তাদেও পেনাল্টি করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এছাড়া নির্মাণ পেছানোর বাস্তব কারণ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কিছুটা সমস্যা আমাদের রয়েছে। সব দিক বিবেচনা করে দ্রুতই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্নের বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৮ সালের শেষ দিকে সেতুটি উদ্বোধনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে এখন সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বরং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেক সেতু দৃশ্যমান করার লক্ষ্যে এখন কাজ চলছে।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, গত নভেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর ২৪০টি পাইলের মধ্যে মাত্র ২০টির ড্রাইভ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ৪০টি পিলারের মধ্যে চারটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। যদিও ১৪ পিলারের নকশা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এগুলোর নকশায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। পিলারগুলো হলোÑমাওয়ার কাছে ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ এবং জাজিরার কাছে ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৫ নম্বর পিলার।

পিলারগুলোর জন্য পানির জিরো ডিগ্রি থেকে ১১০ থেকে ১২০ মিটার গভীর পাইল করতে হবে। তবে পাইলিং করতে গিয়ে মাটির ৪০০ ফুট গভীরে কাদার স্তর ধরা পড়ে। ফলে ওই স্থানে পাইলিং শেষ হলে তা সেতুর ভারবহন করতে পারবে না। লোড টেস্টে পাইল কাদার ভেতরে দেবে যেতে পারে। তাই এখন পাইলগুলোর দৈর্ঘ্য কমিয়ে ও সংখ্যা বাড়িয়ে নকশা করা হচ্ছে। তবে এ কাজ এখনও শেষ হয়নি।

উল্লেখ্য, প্রকল্পটির আওতায় মূল সেতু নির্মাণের চুক্তি মূল্য ধরা হয়েছে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। নদী শাসনের চুক্তি মূল্য আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। জুন পর্যন্ত দুই প্যাকেজের আওতায় ব্যয় হয়েছে যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬০ লাখ ও দুই হাজার ৬৩৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আর পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। যদিও জমি অধিগ্রহণ খাতে এ ব্যয় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন বিলম্বে সেতুটির ব্যয় আরও বেড়ে যাবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..