প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

২০৪১ পর্যন্ত প্রতিবছর বাড়াতে হবে গ্যাস বিদ্যুতের দাম

 

বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পিত উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে আগের মাস্টারপ্ল্যানের ব্যর্থতা ও ২৫ বছর মেয়াদি নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের শেষ পর্ব

ইসমাইল আলী: বিদ্যুতের চাহিদা আগামীতে নতুন নতুন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। এজন্য দরকার প্রচুর বিনিয়োগ। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি বছর প্রচুর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লা আমদানি করতে হবে। এতে বেড়ে যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়। এজন্য ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)

পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ তে মন্তব্য করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে জাইকার অর্থায়নে এটি প্রণয়ন করছে টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার সার্ভিস কোম্পানি। গত মাসে এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জাইকা। এতে আগের মাস্টারপ্ল্যানের ব্যর্থতার পাশাপাশি ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের গতিবিধি তুলে ধরা হয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। সে সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল ৩৯০ কোটি ডলার বা ৩১ হাজার কোটি টাকা। ২০৪১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৫৭ হাজার মেগাওয়াট। আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে তিন হাজার ৩৯০ কোটি ডলার বা তিন লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে গড়ে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ।

এদিকে ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিলোওয়াটপ্রতি গড় ব্যয় ছিল ছয় দশমিক ৭৬ সেন্ট বা পাঁচ টাকা ৩৪ পয়সা। ২০৪১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিলোওয়াটপ্রতি গড় ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১২ দশমিক ১৩ সেন্ট বা ১২ টাকা ১৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে গড়ে তিন দশমিক ৩০ শতাংশ।

বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি প্রতিবছর এর দাম বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানে। এক্ষেত্রে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম গড়ে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। ২০২২ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়াতে হবে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ হারে। আর ২০৩২ থেকে ২০৪১ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে।

মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়েছে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলে দাম কিছুটা কমবে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অনেক বেশি। এ ছাড়া কয়লা, পারমাণবিক ও হাইড্রো পাওয়ারের ব্যয় ডিজেল বা তেলভিত্তিক উৎপাদনের চেয়ে কম। তাই কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে এবং পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কমমূল্যে হাইড্রো পাওয়ার আমদানি করা গেলে বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। অন্যথায় ২০৪১ সালে বিদ্যুতের দাম আরও বেড়ে যাবে।

উল্লেখ্য, মাস্টারপ্ল্যানে কয়লা ও গ্যাস থেকে প্রায় সমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুপারিশ করেছে জাইকা। এতে ২০৪১ সালে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২০ হাজার ১৯৫ মেগাওয়াট। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে কয়লা প্রয়োজন হবে ৭ সাত কোটি ১০ লাখ টন। এর মধ্যে নিজস্ব খনি থেকে সর্বোচ্চ এক কোটি ১০ লাখ টন কয়লা পাওয়া সম্ভব। ফলে ২০৪১ সালে কয়লা আমদানি করতে হবে ছয় কোটি টন।

এদিকে ২০৪১ সালে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৪৭৭ মেগাওয়াট। এজন্য দৈনিক ৬২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার হবে। এর মধ্যে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ২০০ কোটি ঘনফুট। বাকি ৪২০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করতে হবে।

এলএনজির দাম বর্তমানে দেশে সরবরাহকৃত গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি। এজন্য গ্যাসের দামও প্রতি বছর বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানে। এক্ষেত্রে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫৮ দশমিক ৮০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে গ্যাসের দাম। ২০২২ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়াতে হবে ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশ ও ২০৩২ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে।

এদিকে ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে ৭ হাজার ৩২ মেগাওয়াট। এছাড়া তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৭০০ ও হাইড্রো পাওয়ার উৎপাদন করা হবে ৩৩০ মেগাওয়াট।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ শেয়ার বিজকে বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে পিডিবির কিছুই করার নেই। এ ছাড়া দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলারিটি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাব দিতে হয়। সেখানে গণশুনানি হয়, তার পর বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করলে দাম বাড়ে।

এদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে অর্থনীতিতে কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করা হয় মাস্টারপ্ল্যানে। এতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। পাশাপাশি রফতানিতেও প্রভাব পড়বে। তবে জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলেই মনে করে জাইকা।

তবে এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ। তিনি বলেন, প্রতিবছর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত এক ধরনের ষড়যন্ত্র। বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকেই উচ্চ মূল্যের বিদ্যুতের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এতে এমনিতেই জনগণের ওপর এগুলোর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপানো হয়েছে। এর পর প্রতি বছর দাম বৃদ্ধি কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, গভীর সমুদ্রে এখনও গ্যাসের অনুসন্ধান শুরু হয়নি। সেটা বাদ দিয়ে এলএনজি আমদানিতে বেশি মনোযোগী সরকার। অথচ নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেই।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..