প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

২১ ইঞ্জিন সংস্কার না করেই প্রকল্প বাতিল করছে রেল!

ইসমাইল আলী: মেয়াদোত্তীর্ণ ২১টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) মেরামতের জন্য ২০১৯ সালের জুনে প্রকল্প নিয়েছিল রেলওয়ে। তবে তিন বছরে তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাড়া পায়নি কর্তৃপক্ষ। এমনকি শর্ত পরিবর্তন করেও লাভ হয়নি। তাই প্রকল্পটি বাতিল করতে যাচ্ছে রেলওয়ে। এজন্য প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যয় ধরাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুরোনো ইঞ্জিন সংস্কার না করলেও নতুন কেনায় আগ্রহী রেলওয়ে।

গত ২৩ মে রাজধানীর রেল ভবনে প্রকল্পটির স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জানানো হয়, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৪২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ইঞ্জিন মেরামতে গড়ে ব্যয় হবে ১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। তবে তিনটি ইঞ্জিনের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। তিন বছর বসে থেকে এগুলো মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বাকি ১৮টি ইঞ্জিন সংস্কারের কী হবে, না নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৯১টি মিটারগেজ ও ৯২টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৪০টি মিটারগেজ ও ৪৩টি ব্রডগেজ ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এমইএল-১৫ (২৭০০ সিরিজ) শ্রেণির ২১টি ইঞ্জিনের অবস্থা বেশি খারাপ। এজন্য ইঞ্জিনগুলো সংস্কারে উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হয়। এর আওতায় ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৪টি টেন্ডার ডকুমেন্ট বিক্রি হলেও একমাত্র প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। তবে ওই প্রতিষ্ঠানটিও কারিগরিভাবে নন-রেসপনসিভ হয়।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় দরপত্র আহ্বান করলে ১০টি ডকুমেন্ট বিক্রি হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই তা জমা দেয়নি। শেষবার দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছর ২ মে। সেবারও ১০টি ডকুমেন্ট বিক্রি হয়েছিল। তবে কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। আগ্রহ না থাকার ব্যাখ্যায় তারা বলেছেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে তারা লাভবান হতে পারবেন না। কারণ কিছু ইঞ্জিন একেবারেই মেরামতের অনুপযুক্ত। তাই যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা অপ্রতুল। আর এসব ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশও সহজলভ্য না। তাই বাধ্য হয়ে প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় রেল কর্তৃপক্ষ।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, ইঞ্জিনগুলোর মূল যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের প্রোগ্রেস রেল। রেলওয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মেরামত করলে তারা মালামাল ও কারিগরি সহায়তা দেবে বলে মতামত দিয়েছে। তাই প্রকল্প বাতিল করে রাজস্ব খাতে এগুলো মেরামত করা হবে। এজন্য বাজেটে প্রতি ইঞ্জিনের সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকা করে বরাদ্দ লাগবে। এক্ষেত্রে প্রতি বছর তিন থেকে চারটি করে ইঞ্জিন মেরামত করা হবে। আর সাশ্রয়কৃত অর্থে নতুন ইঞ্জিন কেনা যাবে।

যদিও এ প্রস্তাবটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্টিয়ারিং কমিটির সভায় মত দেন কয়েকজন। তারা মনে করছেন, সাড়ে ১১ কোটি টাকায় ইঞ্জিন মেরামতের জন্য ঠিকাদার পাওয়া যায়নি, সেখানে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকায় কোনোভাবেই ইঞ্জিন মেরামত সম্ভব নয়। এতে শুধু অর্থের অপচয় হবে। তাই আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে অথবা বিদ্যমান প্রকল্পটি সংশোধন করে বাকি ১৮টি ইঞ্জিন মেরামত করা উচিত।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক তাবাসসুম বিনতে ইসলাম বলেন, ‘তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও দরদাতা মেলেনি। তাই প্রকল্পটি সমাপ্তের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে বিকল্প সুপারিশও এসেছে। তাই বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। সভার কার্যবিবরণী দেখে বিস্তারিত বলা যাবে।’

এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয়েও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, বর্তমানে ২৭০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলোর কার্যক্ষমতা আশানুরূপ নয়। এজন্য ইঞ্জিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। কিন্তু মালামাল সংগ্রহ ও প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে রাজস্ব বাজেটের আওতায় ওভারহলিং করতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। দিন দিন ট্রেনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এসব ইঞ্জিন সচল রাখাও জরুরি। সে বিবেচনায় প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথমন্ত্রী বিদ্যমান প্রকল্পটি বাতিল করলেও পৃথক আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ১৮টি ইঞ্জিন মেরামতের সুপারিশ করেছিলেন। তবে অজ্ঞাত কারণে সে বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা আগ্রহী নয়।

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইঞ্জিনগুলো মেরামত নিয়ে রেলের দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (রোলিং স্টক ও উন্নয়ন) মধ্যে দ্ব›দ্ব দেখা দিয়েছে। একজন বিদ্যমান প্রকল্পটি বাতিল করে রাজস্ব খাতে মেরামতে আগ্রহী। আরেকজন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এগুলো মেরামতের প্রস্তাব দিয়েছেন। এজন্য প্রকল্পটি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) কেউই মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলপথমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কারওর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।