প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

২৩ বছর আগে কেনা পাটের দাম দেয়নি বিজেএমসি

জাকারিয়া পলাশ: বিলুপ্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশ জুট করপোরেশন (বিজেসি) কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনে বিভিন্ন পাটকলে সরবরাহ করতো। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর সমন্বিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনও (বিজেএমসি) কাঁচা পাট কিনতো বিজেসির কাছ থেকে। ওই সময় কেনা পাটের দাম বাবদ সাড়ে ৩৩ কোটি টাকা বিজেসিকে পরিশোধ করেনি বিজেএমসি। সুদসহ এই অর্থের পরিমাণ আরও বেশি। এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানদুটির মধ্যে বছরের পর বছর হয়েছে পত্র বিনিময়। পাট মন্ত্রণালয়ও দিয়েছে নানা নির্দেশনা।

সূত্রমতে, সর্বশেষ গত জুলাইয়ে বিজেসির চেয়ারম্যান এসএম শওকত আলী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লেখা এক পত্রে বিজেএমসির কাছে পাটের বকেয়া টাকা সুদসহ দাবি করেন। তাতে ওই টাকা পরিশোধের নির্দেশনা দিতে অনুরোধ করা হয় পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। ওই পত্র সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে বিলুপ্তপূর্ব কালে বিজেএমসির পাটকলে পাট সরবরাহ করা হতো। ১৯৯৫-৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সরবরাহ করা পাটের দাম বাবদ মোট পাওনার পরিমাণ ছিল ৩৫ কোটি এক লাখ ৬৩ হাজার টাকা। বিজেসি বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের জুনে এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সভা হয়। তাতে উভয় পক্ষের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ওই টাকা পরিশোধের জন্য বিজেএমসিকে নির্দেশনা দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় বিজেএমসি তিন কিস্তিতে দেড় কোটি টাকা পরিশোধ করে। ফলে বর্তমানে বকেয়া মূল টাকার পরিমাণ হচ্ছে ৩৩ কোটি ৫১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে পাট মন্ত্রণালয় এক পত্রের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য বিজেএমসিকে নির্দেশনা পাঠায়। কিন্তু সে অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিলুপ্ত বিজেসি মোট ১৬টি তাগিদপত্র দিয়েছে বিজেএমসিকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজেএমসির পরিচালক (অর্থ) এম কায়সারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার ঠিক জানা নেই। এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যানই অবগত আছেন।’ কিন্তু বিজেএমসির চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

বিজেসির সূত্র আরও জানায়, ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে একটি যৌথ সভা হয়। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, বিজেএমসির কাছে বিজেসির বকেয়া সমুদয় পাওনা ৩৪ কোটি ১৪ লক্ষাধিক টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। সভায় আরও বলা হয়, সেজন্য বিজেএমসিকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা থেকে ওই পাওনা অর্থ সংকুলান করা যাবে। আর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ না পেলে বিজেএমসি নিজেরই বকেয়া পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার কথা। কিন্তু কার্যত বিজেসিকে কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

পরে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে মন্ত্রণালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় পুনরায় সিদ্ধান্ত হয়। তাতে প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টাকা করে বিজেসিকে পরিশোধের কথা বলা হয়। এর প্রেক্ষাপটে বিজেসির পাওনা টাকা মওকুফের অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রণালয়কে পত্র দেয় বিজেএমসি। মন্ত্রণালয় ওই অনুরোধের বিষয়ে বিজেসির মতামত জানতে চায় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিজেসি থেকে এর জবাবে জানানো হয়, ‘পাওনা টাকা সমন্বয় বা মওকুফের সুযোগ আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।’ এদিকে পাটের এই বকেয়া টাকার বিষয়ে বাণিজ্যিক অডিটের আপত্তি রয়েছে বলেও জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে বিজেসির কর্মকর্তারা বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে মামলা করার কথাও ভাবা হয়েছে। তবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মামলা করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন হয়। এদিকে বিজেসি সূত্রে আরও জানা গেছে, এই বকেয়া অর্থ ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত বিজেসির মালিকানাধীন ২৫টি সম্পত্তি লিজ হিসেবে ব্যবহার করছে বিজেএমসি। ওইসব সম্পত্তির বিপরীতে প্রতি বর্গফুটে ৫ টাকা করে ভাড়া দেওয়ার কথা। এছাড়া সম্পত্তির খাজনা ও কর আদায়ের কথা বিজেএমসির। এ বাবদও বিপুল অর্থ বকেয়া রয়েছে বিজেএমসির কাছে।

বিজেসির সহ-সচিব মো. রেজাউল ইসলাম এ বিষয়ে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নানাভাবেই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিজেসিকে পাওনা অর্থ দিচ্ছে না। এ অবস্থায় জনবলহীন বিজেসির পক্ষে সরকারি সম্পদ ও সম্পত্তিগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, মামলা পরিচালনা ও নিরীক্ষা আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ছে। বিপুল এই সম্পত্তিকে উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এ অবস্থায় বিলুপ্ত ঘোষিত বিজেসিকে একটি মিনি করপোরেশন হিসেবে চালু করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।’