প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

২৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ লাগবে এক লাখ আট হাজার কোটি টাকা

আদানির বিদ্যুৎ ক্রয়

ইসমাইল আলী: ভারতের আদানি গ্রুপের গড্ডা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ বছর বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ। এ সময়ে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে গুনতে হবে এক লাখ আট হাজার ৩৬১ কোটি টাকা (১১.০১ বিলিয়ন ডলার)। এ অর্থ দিয়ে কমপক্ষে তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। ‘আদানি গড্ডা কোল পাওয়ার প্ল্যান্ট: অ্যান অ্যাকিলিস হিল অব দ্য পাওয়ার সেক্টর অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনা-বিষয়ক কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) ও ভারতীয় গ্রোথওয়াচ যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেছে, যা গতকাল প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ও

বিডব্লিউজিইডি’র সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, আদানিকে ২৫ বছরে যে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হবে তার পরিমাণ কর্ণফুলী টানেলের মোট বাজেটের ৯ গুণ এবং ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের চারগুণেরও বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানি গ্রুপ প্রতি বছর কমপক্ষে তিন হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা (৪২.৩৩ কোটি ডলার) ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে নিয়ে যাবে, যা বাংলাদেশের জনগণের উপকার না করে বরং আদানি গ্রুপকে আরও ধনী হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

প্রকল্পটির হালনাগাদকৃত অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুসারে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আগামী আগস্টে আদানির কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করবে। যদিও সঞ্চালন লাইন না হওয়ায় এখনই কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। আগামী ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হলেও আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে এক ইউনিট বিদ্যুৎ না কিনেও এক হাজার ২১৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে বাংলাদেশকে।

প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আদানি পাওয়ারের এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে বর্তমানে কমপক্ষে ৯ টাকা ৯ পয়সা, যা বর্তমানে আমদানিকৃত বিদ্যুতের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি এবং ভারতের সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় ১৯৬ শতাংশ বেশি।

এ ছাড়া আদানি গ্রুপের গড্ডা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের দাম প্রতি বছর কমপক্ষে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে বাড়বে। এতে ২০৪৭ সালে আদানির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়ে দাঁড়াবে ৩৬ টাকা ৪১ পয়সা। যদিও দেশে ও প্রতিবেশী দেশ ভারতে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের দাম প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে কমছে।

হাসান মেহেদী বলেন, ‘এ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করবে। বাংলাদেশের অতিসক্ষমতার মাত্রা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও ভারত থেকে অতি-খরুচে বিদ্যুৎ আমদানির কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, গড্ডা কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত ক্ষতিকর কার্বনের পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির (স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও মৎস্য) পরিমাণ বছরে পাঁচ হাজার ৫৬৯ কোটি ভারতীয় রুপি (৭২ দশমিক ৯৬ কোটি ডলার)। এতে ২৫ বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে কমপক্ষে এক লাখ ৮৮ হাজার ৭০৮ কোটি ভারতীয় রুপির (২৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার) সমান। যদিও আদানি পাওয়ার পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ-বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) ২০১৭ সালের নভেম্বরে আদানি গ্রুপের গড্ডা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি (পিপিএ) করে। পিপিএ অনুসারে, বিউবো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিপরীতে আদানি গ্রুপকে তিন টাকা ২৬ পয়সা (০.০৩৮ ডলার) ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়ায় সম্মত হয়, যা বাংলাদেশের অন্য যে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি।

সূত্রমতে, চুক্তির পর আদানি গ্রুপ ঝাড়খন্ডের স্থানীয় অধিবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যথাযথ ক্ষতিপূরণ না দিয়েই এক হাজার ২৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এছাড়া কোম্পানিটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে স্থানীয় অধিবাসীদের উচ্ছেদ ও অত্যাচারের অভিযোগ রয়েছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি বছর ৯৩ দশমিক ৫০ লাখ টন কার্বন নির্গমন হবে, যা ২৫ বছরের মেয়াদকালে ২২ কোটি ১১ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। ভারত বর্তমানে বায়ুদূষণের দিক দিয়ে পৃথিবীর পঞ্চম ও কার্বন নির্গমনের দিক দিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র দূষণ ও কার্বন নির্গমনের দিক দিয়ে ভারতের অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার এককভাবে এ কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি বাতিল করতে পারবে না। তাই প্যারিস চুক্তি ও গাসগো প্রতিশ্রুতির আলোকে বর্তমান চুক্তি সংশোধন করে ভারত থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যে একটি যৌথ কমিটি গঠনের জন্য উভয় দেশের সরকারের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। পাশাপাশি গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার আগ পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ বিধান আরোপ ও বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে কার্বন নির্গমন ও মানবাধিকারের মানমাত্রা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।

প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ও গ্রোথওয়াচের সমন্বয়কারী বিদ্যা দিনকর বলেন, ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা অনুসারে ভারত বা অন্য প্রতিবেশী দেশ থেকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ আমদানি বন্ধ করে শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমদানির জন্য বাংলাদেশ সরকারের কঠোর অবস্থান নেয়া উচিত।’

পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার আওতায় আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের জন্য আদানি গ্রুপকে বাধ্য করার জন্য নির্দেশ দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় প্রতিবেদনটিতে।

বিডাব্লিউজিইডি’র আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের চুক্তি বাতিল করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’