Print Date & Time : 2 March 2021 Tuesday 1:30 am

২৫ ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের ৮৫ শতাংশ

প্রকাশ: December 2, 2020 সময়- 10:42 pm

জয়নাল আবেদিন: ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বোঝা জেঁকে বসেছে গুটিকয়েক ব্যাংকের ঘাড়ে। ফলে দিনের পর দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকের মোট খেলাপির ৮৫ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছিল মাত্র ২৫টি ব্যাংকের মাধ্যমে, যার পরিমাণ ৮০ হাজার ৩৫০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। খেলাপি হওয়া এসব অর্থের বেশিরভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে খেলাপি হওয়া এসব অর্থ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে এসব অনিয়ম কমে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৪৪০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর সিংহভাগই মাত্র ২৫টি ব্যাংকের দায়। স্থিতির দিক থেকে তালিকার শীর্ষে থাকা ২৫ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার ৩৫০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তথ্য বলছে, এসব টাকার বেশিরভাগই খেলাপি হয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। সর্বনি¤œ এক হাজার কোটি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিস্তৃত এসব ব্যাংকের খেলাপির আকার।

সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি স্থিতির দিক থেকে সবার ওপরে রয়েছে জনতা ব্যাংক লিমিটেড। এই সময়ে ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর পরই রয়েছে সরকারি খাতের অপর ব্যাংক সোনালী। সেপ্টেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১৯৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা জুন প্রান্তিকের তুলনায় ১১১ কোটি টাকা বেশি। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। খেলাপির পরিমাণ সাত হাজার ৬০৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

আলোচ্য সময়ে শেষে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ছিল ছয় হাজার ৩৯২ কোটি ৯৩ লাখ এবং রূপালী ব্যাংকের চার ১০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

এর বাইরে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের শীর্ষে রয়েছে এবি ব্যাংক লিমিটেড। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪৭৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা বেশি।  তিন হাজার ৬৯৩ কোটি ছয় লাখ টাকার খেলাপি নিয়ে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড। এরপরে রয়েছে পদ্মা ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকের মোট খেলাপি পরিমাণ তিন হাজার ৩১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তিন হাজার ২১৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা খেলাপি নিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর অবস্থান নবম। আর দশম স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি দুই হাজার ৭৩২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। হিসাব করে দেখা গেছে স্থিতির দিক থেকে শীর্ষ ১০ ব্যাংকেই ৫৯ হাজার ৯৬৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকার খেলাপি রয়েছে।

শীর্ষ ২৫ ব্যাংকের মধ্যে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলোÑআল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এক্সিম ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, মোট খেলাপি ঋণের ৮৬ শতাংশই আদায় অযোগ্য। সেপ্টেম্বর শেষে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৬১ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা আগের  প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কম।

এদিকে এত সুযোগ-সুবিধার পরেও ব্যাংক খাতের সার্বিক মোট খেলাপি ঋণ কমে এলেও বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ ব্যাংকের খেলাপি। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ ব্যাংক হলো সোনালী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আল-আরাফাহ্, অগ্রণী, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, এবি, ওয়ান, সোশ্যাল ইসলামী, এইচএসবিসি ও মেঘনা ব্যাংক।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণসহ ব্যাংক খাতে জালিয়াতি বাড়লেও রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোয় পরিদর্শনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে ঋণখেলাপিদের সাহস আরও বাড়বে। ঘটতেই থাকবে হলমার্ক, এননটেক্স ও ক্রিসেন্টের মতো দুর্ঘটনা।